দেশে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী রোববার থেকে এই কর্মসূচি শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বৃহস্পতিবার থেকে বাতিল করা হয়েছে। তারা স্থানীয় কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন।
মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ হামের টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। বৃহস্পতি ও শুক্রবারের মধ্যে সিরিঞ্জ সংগ্রহ সম্পন্ন করে বেশি আক্রান্ত উপজেলাসহ দেশের সব উপজেলায় টিকা পাঠানো হবে। আগামী দুই দিনের মধ্যে গ্রামাঞ্চলেও টিকা ও সিরিঞ্জ পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
টিকার জোগান প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইউনিসেফের সহায়তায় আগে আনা টিকা দিয়েই এই জরুরি কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৬০৪ কোটি টাকায় নতুন টিকা কেনার প্রক্রিয়াও চলছে। সেই টিকা এলে আবার জুন-জুলাইয়ে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে। এই কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। যারা আগে টিকা নিয়েছে, তারাও এ কর্মসূচির আওতায় আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আরও বলেন, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া যুক্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এতে ফুসফুসে শ্লেষ্মা জমে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, যা শিশুর জন্য ভয়াবহ হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ‘বাবল সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ মাস থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হামের রোগীদের প্রায় ৩০ শতাংশই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজশাহীসহ ওই বিভাগের বিভিন্ন স্থানে এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরীক্ষা করা ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুর সঙ্গে হামের সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। রাজশাহী অঞ্চলে সংক্রমণ বেশি হওয়ায় সেখানে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দীন হায়দার বলেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো জনসাধারণকে আশ্বস্ত, মাঠপর্যায়ের সেবা জোরদার এবং সংক্রমণ বিস্তার রোধ করা।
কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে এ বিষয়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, যেসব উপজেলায় সংক্রমণ বেশি, সেসব এলাকার তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানানো যাবে।
চিকিৎসকেরা জানান, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। জ্বর, সর্দি, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ এর প্রধান উপসর্গ। আক্রান্ত শিশু থেকে অন্য শিশুতে দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই টিকাদান নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ৫১৩ শিশু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১৩ শিশু। তাদের মধ্যে ২১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে এক শিশু। অধিদপ্তরের থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হাম ছড়িয়েছে ৫৬ জেলায়। চলতি বছরে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ২৯৫ জন শিশু এবং ৪০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৩ জনের হাম শনাক্ত করা গেছে এবং মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
হাসপাতালে বাড়ছে ভর্তির চাপ
গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এতে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। চিকিৎসকেরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতি ও অসচেতনতার কারণেই সংক্রমণ বাড়ছে।
চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ১৬ জন মহানগরের বাসিন্দা এবং দুইজন বিভিন্ন উপজেলার। তবে এ সময়ে নতুন করে কোনো রোগী ল্যাবে নিশ্চিত হয়নি। এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজারের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম।
ময়মনসিংহে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে ২১ শিশু ভর্তি হয়েছে। গত ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই সপ্তাহে মোট ১৪৩ শিশু ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৮৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৬৪ জন। বাড়তি চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের একটি কেবিনে ৬৪ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে, যাদের এখনও টিকা নেওয়ার সময় হয়নি। বাকি শিশুদের মধ্যে কেউ এক ডোজ, কেউ দুই ডোজ টিকা পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সামগ্রিক টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়াই সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ।
হবিগঞ্জে মা-ছেলেসহ চারজন হাম আক্রান্ত রোগী সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে এক দিনেই তিনজন ভর্তি হওয়ায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকেরা জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে গত ১০ দিনে অন্তত ২০০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ এখনও চিকিৎসার জন্য কবিরাজ ও ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।