প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেছেন, ‘দেশপ্রেম, ঐকান্তিক ইচ্ছা আর টিম স্পিরিট থাকলে আপনাদের সাফল্যজনক অগ্রযাত্রায় কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না বলে বিশ্বাস করি। আপনাদের প্রতি আহ্বান, পেশাদার খেলোয়াড়ি জীবনে আপনারা কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নয়, বরং ক্রীড়ানৈপুণ্য দিয়ে দেশের প্রতিনিধি হয়ে উঠুন। দেশে-বিদেশে বিজয়মাল্য বরণ করে বিশ্ব ক্রীড়া জগতে বাংলাদেশকে উচ্চতর মর্যাদার আসনে সমাসীন রাখুন।’ সোমবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ক্রীড়াবিদদের মধ্যে ক্রীড়াকার্ড ও ভাতা বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপে বাটন প্রেস করার সঙ্গে সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে প্রত্যেক ক্রীড়াবিদের মোবাইলে এক লাখ টাকা পৌঁছে যায়। এ সময় ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদদের সম্মাননা প্রদান করেন। এর আগে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে একে একে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব-উল-আলম। এরপর ক্রীড়াবিষয়ক ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রচার করা হয়। এতে দেশের ক্রীড়া অঙ্গনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তাদের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অবদান তুলে ধরা হয়। খেলোয়াড়দের জীবনমান উন্নয়ন, নতুন খেলার মাঠ তৈরি, তৃণমূল থেকে মেধাবী খেলোয়াড় তুলে আনতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন পরিকল্পনার চিত্রও তুলে ধরা হয়। ২০ ডিসিপ্লিনের ১২৯ জন ক্রীড়াবিদ এই কর্মসূচির আওতায় সম্মাননা পেয়েছেন। এ কর্মসূচির ফলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন যুগের সূচনা হলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনুষ্ঠানে এমন কিছু মানুষ উপস্থিত হয়েছেন যারা সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায় বিজয়ী হয়েছেন, দেশের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। খেলাধুলার বিভিন্ন শাখায় যারা সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন ইতোমধ্যেই তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। যারা বিজয়ীর পুরস্কার নিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেরই প্রতিপক্ষ ছিল। প্রতিপক্ষ ছিল বলেই আপনি বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করতে পেরেছেন। সুতরাং খেলাধুলায় পরাজয়ের অর্থ কিন্তু হেরে যাওয়া নয় বরং জয়েরই একটা অংশ। আলবার্ট আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন, যে মানুষটি কখনো পরাজিত হয়নি, সে কখনো কিছু করেইনি।
অনুষ্ঠানে যারা পুরস্কার গ্রহণ করেছেন এবং প্রতিটি খেলাকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তুলতে যারা অংশগ্রহণ করেছেন সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের পরিবার, কোচ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা বিশ্বাস করি বর্তমান সময়ে ক্রীড়া শুধু শখ, বিনোদন কিংবা শরীর চর্চার বিষয় নয় বরং সারা বিশ্বে ক্রীড়া এখন পেশা হিসাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে থাকবে না। ২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে আমরা দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, জনরায়ে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনার সুযোগ পেলে দেশে ক্রীড়াকে পেশা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করব। জনগণের কাছে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যিনি যে খেলায় ভালো করতে পারবেন, যারা যে খেলায় আনন্দ পাবেন, তারা যাতে তাদের পছন্দের খেলাটিকে নিশ্চিন্তে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে মনোযোগ দিয়ে খেলাধুলা করতে পারেন এবং খেলাধুলাকে পেশা হিসাবে নিয়ে একজন খেলোয়াড় যাতে নিজের এবং পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা টানাপোড়েনে না ভোগেন, সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকভাবে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে বেতন কাঠামোর আওতায় আনার কাজটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্রীড়াবিদদের বেতন কাঠামোর আওতায় এনে ক্রীড়া ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই পর্যায়ক্রমিক ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-খতিব এবং অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানি ভাতা প্রদান এবং সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছে। আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান কর্মসূচি। এভাবেই দেশ এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ থেকে শুরু হলো ‘ক্রীড়া কার্ড’।
তারেক রহমান বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী যারা ক্রীড়াঙ্গনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম তারাও ক্রীড়া কার্ড পাবেন। ‘সবার জন্য ক্রীড়া’-এই প্রতিপাদ্যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি যারা খেলাধুলায় অংশ নিতে চান তাদের জন্যও দেশে-বিদেশে সব ধরনের সুবিধা প্রদান করতে সরকারের পক্ষ থেকে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্রীড়াকে পেশা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকার ব্যাপক এবং বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দেশে বর্তমানে ক্রিকেট এবং ফুটবল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় খেলা। তবে এসব খেলার পাশাপাশি আরচারি, বক্সিং, ইয়োগা, জিমন্যাস্টিকস, ক্যারাম, ভারোত্তোলন, সাঁতার, প্যারা-সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, প্যারা-অ্যাথলেটিক্স, কারাতে, সেপাক টাকরো, টেবিল টেনিস, কাবাডি, ভলিবল, হুইলচেয়ার বাস্কেটবল, ব্রিজ, ফুটসাল এবং ব্যাডমিন্টনের মতো আরও অনেক ক্রীড়া রয়েছে। সম্প্রতি সাফ নারী ফুটসালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার খেলাধুলাকে পেশা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই যাতে খেলাধুলার সুযোগ পায়, এ জন্য শিক্ষা কারিকুলামে ৪র্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা চাই আমাদের সন্তানরা পড়ালেখার পাশাপাশি ছোটবেলায় নিয়মিত খেলাধুলায়ও আগ্রহী এবং পারদর্শী হয়ে উঠবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ইতোমধ্যেই খেলাধুলাকে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা কারিকুলাম পরিমার্জনের কাজ শুরু হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ ১৯৭৬ সালে শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটি একপর্যায়ে অনেকগুলো বছর বন্ধ থাকলেও বর্তমানে অনুষ্ঠানটি বিটিভিতে আবার চালু হয়েছে। এবার ভিন্ন আঙ্গিকে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করতে আগামী ৩০ এপ্রিল সিলেট থেকে সারা দেশব্যাপী নতুন পরিসরে শুরু হতে যাচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (এলজিআরডি) এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন প্রমুখ।