বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবনী ঃ
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০–১৯৩২) ছিলেন বাংলা ও উপমহাদেশের নারী জাগরণের পথিকৃৎ। তিনি একজন লেখিকা, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক এবং নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। মুসলিম সমাজে যখন নারীরা ছিল অবরুদ্ধ, তখন তিনি নারীশিক্ষা, নারী-স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন।
জন্ম ও পরিবার
বেগম রোকেয়ার জন্ম ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে। তার পিতার নাম জহিরুদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মাতার নাম রাহাতুন্নেছা খাতুন। তিনি ছিলেন ছয় ভাইবোনের মধ্যে অন্যতম। তার পরিবার ছিল ধর্মভীরু ও রক্ষণশীল; মেয়েদের শিক্ষাদীক্ষা নিষিদ্ধ ছিল বললেই চলে।
রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ছিলেন আধুনিক মনস্ক এবং শিক্ষিত। তার অনুপ্রেরণায় রোকেয়া বাংলা, আরবি ও ফারসি ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাও শিখতে সক্ষম হন। যদিও সমাজের চোখে এটি ছিল একপ্রকার অপরাধ।
বিবাহ ও শিক্ষাদান
১৮৯৬ সালে তার বিয়ে হয় ভাগলপুর জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। স্বামী রোকেয়ার শিক্ষা ও লেখালেখির আগ্রহকে উৎসাহিত করতেন। এই সহায়তার ফলে রোকেয়া সাহিত্যে মনোনিবেশ করতে পারেন এবং পরবর্তীতে নারী শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯১১ সালে তিনি কলকাতায় মুসলিম মেয়েদের জন্য সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এই বিদ্যালয় ধীরে ধীরে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং মুসলিম নারী শিক্ষার মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়।
সাহিত্যচর্চা
বেগম রোকেয়া ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী এবং নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী লেখিকা। তার সাহিত্যকর্মের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজে নারীর অধঃস্থল অবস্থার প্রতিবাদ ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। তিনি লেখালেখির মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতা, শিক্ষা ও স্বাধীনতার কথা বলেন।
তার বিখ্যাত গ্রন্থ “সুলতানার স্বপ্ন” (১৯০৫) একটি কল্পকাহিনি, যেখানে পুরুষরা থাকে পর্দার আড়ালে এবং নারীরা সমাজ পরিচালনা করে। এটি ছিল নারীবাদী সাহিত্যের প্রাথমিক নিদর্শনগুলোর একটি। তিনি যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজো আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে:
মতিচূর (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)
অবরোধবাসিনী
নারীর অধিকার বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ
সমাজ সংস্কার ও আন্দোলন
শুধু লেখালেখি নয়, রোকেয়া বাস্তব জীবনে নারীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীশিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজ উন্নত হতে পারে না। এ লক্ষ্যে তিনি আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম নামক একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যা নারীদের সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় কাজ করত।
তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন—”নারী যদি গরু-ছাগলের চেয়ে অধম হয়, তবে কেন তারা মানুষের জাত বলে গণ্য হবে?” এই ধরনের সাহসী উচ্চারণে তিনি সময়ের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানান।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি নারী শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। সেদিনই তিনি নারী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন।
তার মৃত্যুর পরও তার আদর্শ, শিক্ষা ও সাহসিকতা সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর “রোকেয়া দিবস” হিসেবে পালিত হয়। নারীদের ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার “রোকেয়া পদক” প্রবর্তন করেছে।
উপসংহার
বেগম রোকেয়া ছিলেন বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা, সাহস ও সম্ভাবনার প্রতীক। এক ভয়াবহ রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—সঠিক শিক্ষা ও সাহস থাকলে একজন নারীও সমাজকে বদলে দিতে পারে।