প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ‘একুশে গ্রন্থমেলা’ আমাদের দেশে বই প্রকাশের একটি বড় উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বছর টুকটাক বই প্রকাশিত হয়। কিন্তু অধিকাংশ বই-ই প্রকাশিত হয় একুশে গ্রন্থমেলাকে সামনে রেখে। মাসব্যাপী এই মেলার দিন যত ঘনিয়ে আসতে থাকে লেখক, প্রকাশক, ছাপাখানা, বাঁধাইখানার ব্যস্ততা ততই বাড়তে থাকে। একুশে গ্রন্থমেলায় এত যে বই প্রকাশিত হয় এসবের পা-ুুলিপি তৈরি হয় কখন? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ পা-ুুলিপি তৈরি হয়ে যায় ঈদ মৌসুমে।লেখালেখিটা লেখকের অন্তর্গত ব্যাপার। তার পরই ‘বাইরের তাড়া’ বলে একটা ব্যাপার আছে। সেটা কেমন? অনেক সময় প্রকাশের তাড়া থেকেও লেখকের কলমে গতি আসে। যেমন ঈদসংখ্যার চাপে অনেক লেখা তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণ লেখেন, যাদের জনাদৃতি আছে, তেমন লেখকের ব্যস্ততা তো ঈদের কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। আমাদের দেশে ঈদসংখ্যাগুলোয় সাহিত্যের একটা বিশাল সম্ভার প্রকাশের আধার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে থেকে এই ‘ঈদসংখ্যা’ প্রকাশের চল শুরু হয়েছে? জানা যায়, ১৯০৩ সালে প্রকাশিত সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকাই খুব সম্ভবত প্রথমবার ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে, ১৯০৩, ১৯০৪, ১৯০৫Ñ পর পর এই তিন বছরই ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে। এখন যেমন বিচিত্র লেখা নিয়ে ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয় এক সময় এমনটা ছিল না, ঈদবিষয়ক গদ্য-পদ্য নিয়ে একটি সংখ্যা সাজানো হতো। আমাদের দেশে ‘ঈদসংখ্যা’ প্রকাশ একটা গৌরবময় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এক সময় কোনো কোনো সাহিত্য-সাময়িক পত্রিকা বিশেষ আয়োজনে ‘ঈদসংখ্যা’ প্রকাশ করত। স্বাধীনতার পর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যে নতুন চিন্তা-চেতনার সূত্রপাত হয়েছিল, ঈদসংখ্যাগুলো ছিল এর অন্যতম বাহক। যদি বলি ‘বেগম’ পত্রিকার কথা, এটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, শুধুু মহিলাদের লেখাই এতে প্রকাশিত হয়। এর ঈদসংখ্যাটি ছিল পাঠকের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। ডাউস এ সংখ্যায় বিপুল লেখার সঙ্গে ‘লেখিকা’দের ছবিও ছাপা হতো, ব্লকের যুগ থেকে বর্তমানে অফসেটের যুগে এসেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’, ‘সন্ধানী’, ‘রোববার’ ঈদসংখ্যা প্রকাশের একটি উজ্জ্বল ঐতিহ্য স্থাপন করেছিল। পরবর্তী সময় যোগ হয়েছিল অন্যান্য সাপ্তাহিক পত্রিকার সঙ্গে ‘স্বদেশ’ ও ‘বিপ্লব’ পত্রিকার ঈদসংখ্যা। এখন তো সাহিত্য-সাময়িকী ছাড়াও দৈনিক পত্রিকা ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে থাকে। মূলধারার দৈনিক ছাড়াও অন্যান্য দৈনিকও ঈদসংখ্যা প্রকাশের দৌড়ে শামিল হয়। এদের আয়োজনও বেশ ভালো হয়। কয়েকটি দৈনিক অবশ্য ঈদসংখ্যা ম্যাগাজিন না করে ব্রডশিটেই বিশেষ আয়োজনে ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে থাকে। আজকাল তো কোনো কোনো পত্রিকা আনুষ্ঠানিকভাবে লেখকদের হাতে বর্ণাঢ্য ঈদসংখ্যা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে থাকে। এটাও একটি আনন্দ-আয়োজন। রোজার দিন হওয়ায় ইফতার আয়োজন থাকে, থাকে লেখকদের হাতে ঈদসংখ্যা এবং ‘সম্মানী’ দেওয়ার ব্যাপারটিও। এ যেন ঈদের আগেই একটি আনন্দ সম্মিলন। বর্তমানের ঈদসংখ্যাগুলোয় উপন্যাস, প্রবন্ধ-গল্প, কবিতা-ভ্রমণ ইত্যাদির পাশে ছাপা হয় সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ বিচিত্র রচনা। এক মলাটে, সহনীয় মূল্যে বিপুল রচনারাশি পাঠের সুযোগÑ বিষয়টি আনন্দের তো বটেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঈদসংখ্যা সংগ্রহ করা অনেকটাই ঈদ আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদসংখ্যা সূত্রপাতের সময়ে ঈদবিষয়ক লেখাই ছিল ‘ঈদসংখ্যা’র বৈশিষ্ট্য। এখনো এ ঐতিহ্য চালু আছে। বর্তমানের ঈদসংখ্যাগুলো সাহিত্যনির্ভর হলেও ঈদবিষয়ক লেখাও থাকে। গদ্য-পদ্য মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যের ধারায় ‘ঈদের সাহিত্য’ও একটি বিশিষ্টতা অর্জন করেছে। নবনূর পত্রিকাটি যদি আমরা চিহ্নিত করি ঈদসংখ্যা প্রকাশের প্রথম পত্রিকা হিসেবে, দেখা যাবে, সে সময়ের বিখ্যাত অনেকেই ওই পত্রিকায় ঈদবিষয়ক লেখা লিখেছেন। ‘নবনূর’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী নিজে এবং কায়কোবাদ ও মিসেস আর এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়াÑ এই তিনজনই নবনূর-এর পৌষ ১৩১১ সংখ্যায় কবিতা, গদ্য লিখেছেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক বামপ্রাণ গুপ্ত নবনূর-এর ফাল্গুন ১৩১১ সংখ্যায় লিখেছিলেনÑ ‘ঈদজ্জোহা’ নাম প্রবন্ধ। জীবন্দু কুমার দত্তের ঈদ সম্মিলিন কবিতা এবং মিসেস আর এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়ার ঈদ সম্মিলিন প্রবন্ধে ঈদের তাৎপর্য উল্লিখিত হয়েছিল, ‘ঈদ আবাহন’ নামে কায়কোবাদ দুটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাংশ ১. ‘আজি এ ঈদের দিনে/এ পবিত্র শুভক্ষণে/এস ভাই এক সনে হৃদয় বাঁধিয়া। ২. ‘আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মনঃপ্রাণ/জাগায়ে মোশ্লেম সবে গাহ আজি মিলনের গান।’ঈদবিষয়ক সাহিত্যের যে ধারাটি বহমান, এর শীর্ষে রয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম। তার অসংখ্য গান, প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কবিতায় ঈদের তাৎপর্য, মহামানবিকতা বিধৃত আছে। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের ‘ঈদ মোবারক’ যেমন সম্পূর্ণতম কবিতা, তেমন সম্পূর্ণতম গান হচ্ছে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ তিরিশের দশকে রচিত এই গান যুগ যুগ ধরে বাঙালি মুসলমানকে কথায়, সুরে, ছন্দে নাচিয়ে রেখেছে, চিরকালই এই গান মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে ঈদের মূল চেতনার আলোয়। উল্লিখিত এ গানটি একাই একশ। বছরে, রোজার শেষ, ঈদের আনন্দ আগমনী ঘোষণায় এ গান মানুষের মনে নতুন দ্যোতনা নিয়ে হাজির হয়। গানটির সুর, ছন্দ অমৃতপূর্ব। এর কাব্যিক মূল্য অতুলনীয়। ঈদ শব্দের সঙ্গে আসমানি ‘তাকিদ’, ‘নিদ’, ‘শহীদ’, ‘মুবিদ’, ‘মফিদ’, ‘উমীদ’ এবং ‘মসজিদ’ শব্দের যে ছন্দমিল রচিত হয়েছে, তা বিস্ময়কর, নান্দকিতায় পূর্ণ। কাজী নজরুল ইসলামের সমকালে ও পরবর্তী সময় ঈদবিষয়ক কবিতা ও গদ্যের ধারা অব্যাহত থাকে। আবদুল মান্নান সৈয়দ তার প্রবন্ধে লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বেগম রোকেয়া, সৈয়দ এমদাদ আলী, কাজী ইমদাদুল হক, এয়াকুব আলী চৌধুরী, ডা. লুৎফর রহমান, ড. মুহম্মদ শহীদ্ল্লুাহ প্রমুখ যে চিন্তার চর্চা শুরু করেন, বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তা বিশেষভাবে ফলবান হয়ে ওঠে কয়েকজন ভাবুকের রচনায়। এদের শ্রেষ্ঠ দুজন হচ্ছেন কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪)। এদের দুজনেরই বহুমাত্রিক ভাবনার মধ্যে ঈদ প্রসঙ্গও এসেছে। আমাদের তিরিশের কবিদের কেউ কেউ ঈদের কবিতা লিখেছেন। কবি মঈনুদ্দীন, সুফিয়া কামাল, সিকান্দার আবু জাফর, আবুল হোসেন, র্ফরুখ আহমদ, তালিম হোসেন, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আজিজুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, মনোমোহনÑ এদের নাম উল্লেখ করা যায়। শামসুর রাহমানের একটি কবিতায় তার শৈশবের ঈদের আনন্দের বর্ণনা আছে, শহীদ কাদরীর কবিতায় ‘সুনীল ঈদগাহ’ দেখা দেয় প্রতীক হয়ে। ঈদ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব হলেও এর অন্তর্গত চেতনার সর্বজনীনতায় এবং মহত্তম উদার মানবিকতার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাহিত্য-সংস্কৃতির অংশও হয়ে উঠেছে। এ ধারা চিরকাল আরও বেগবান হবেÑ এমন প্রত্যাশাই সবার।