মশার কামড়ে রাজধানীসহ সমগ্র দেশে মানুষ অতিষ্ঠ হইলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কোনো হেলদোল নাই বলিয়া মঙ্গলবার সমকালে যেই সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা উদ্বেগজনক। মশার ভয়াবহতা তৈরি হইলেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন-ডিএনসিসির কোনো তৎপরতা দৃশ্যমান নহে। এমনকি এক আইনজীবী এই বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ প্রেরণের এক মাসের অধিক সময় অতিক্রান্ত হইলেও এই ব্যাপারে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলি যেন স্থাণু। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসি, সংস্থার প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুসারে, মশার ঔষধের কার্যকারিতা পরীক্ষায় ব্যস্ত। গত ১৬ মাসে চট্টগ্রামে মশাবাহিত দুই রোগে ৪৮ জনের প্রাণ গেলেও দৃশ্যমান নহে মশক নিধন কার্যক্রম, যদিও কাগজ-কলমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে এই বাবদ কোটি টাকা ব্যয় করিয়াছে। সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রাজশাহী নগরীর প্রতিটি এলাকায় মশার উপদ্রব অস্বাভাবিক বাড়ন্ত। খুলনা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও সিলেটের অবস্থা তথৈবচ। কোথাও লোকবল নাই বলিয়া মশার ঔষধ ছিটানো যাইতেছে না; কোথাও ঔষধ বা মশা নিধন যন্ত্র ফগার মেশিন ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নাই। এক কথায় সিটি করপোরেশন বা অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ এলাকায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেই দায়িত্ব পালন করিবার কথা, তাহা অপালিত। ফলে মশার অব্যাহত আক্রমণের মুখে নাগরিকগণ এক প্রকার অসহায়।
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলিয়াছেন, এই মশা কিউলেক্স প্রজাতির, যাহা কামড়াইলেও সমস্যা নাই। কিউলেক্স মশা প্রাণঘাতী কোনো রোগের জীবাণু বহন না করিলেও, তাঁহার এই বক্তব্য ভীষণ অসংবেদনশীল বলিয়া প্রতীয়মান। প্রথমত, এই বক্তব্যে স্বীয় দায়িত্বের প্রতি তাঁহার ঔদাসীন্য প্রকাশ পাইয়াছে; দ্বিতীয়ত, একসময়ে ঋতুচক্রের এই পর্বে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা দেখা না গেলেও সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কম নহে। প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থানের এই সংক্রান্ত পরিসংখ্যান উহাই বলিতেছে। উপরন্তু ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী অ্যানোফিলিস মশাও এই সময়ে বিরল নহে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সমকালকে বলিয়াছেন, বেশ কিছুদিন বৃষ্টি না থাকায় ড্রেন, বক্স-কালভার্ট ও জলাধারগুলিতে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ। যেই সকল স্থানে পানি আছে, তাহাও পচিয়া গিয়াছে। আবার শীত চলিয়া যাওয়ায় তাপমাত্রাও বাড়িতেছে। এই সকল কারণে এই সময়ে মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিকভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাইবার কোনো বিকল্প নাই। মনে রাখিতে হইবে, এই সময়ে বিদ্যালয়গুলি রমজানের কারণে বন্ধ থাকিলেও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠ কার্যক্রম বন্ধ নাই। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নানা প্রকার পরীক্ষা চলমান। সর্বোপরি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতিও পুরাদমে চলিতেছে, যেইখানে মশার কামড় এবং বিরক্তিকর ভনভনানি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাইবার জন্য যথেষ্ট। ইহাতে শুধু ঐ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে না; তাহাদের পরিবার এবং রাষ্ট্রেরও অপূরণীয় ক্ষতি হইতে পারে।
আমরা জানি, যেই অব্যবস্থাপনা ও সংকটের কারণে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলি উহাদের নিজ নিজ এলাকার বাসিন্দাদের নিকট হইতে নিয়মিত বর্জ্য ও পয়ঃপ্রণালি পরিষ্কারের জন্য কর সংগ্রহ করিবার পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারিতেছে না, তাহা দূরীকরণের দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। কিন্তু তাহারা অন্য ক্ষেত্রের ন্যায় এই ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে। আবার বর্তমান নির্বাচিত সরকার সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছে। বিভিন্ন সিটি করপোরেশনেও নূতন প্রশাসকগণ মাত্রই কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু প্রয়োজন মানে না বারণ। অতএব তাহাদিগকে দ্রুত মশার আক্রমণে জনস্বাস্থ্য সংকট তীব্রতর হইবার পূর্বেই প্রয়োজনীয় ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ লইতে হইবে।