সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২২ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

শীত আসে, কুয়াশাও আসে, পিঠাপুলির উৎসব কই?

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের শীত মানেই এক ধরনের আনন্দ, ধীরস্থির সময় আর স্মৃতির ভাঁজ খুলে ‍উঠে আসা সোনালি দিনের মৌসুম। কুয়াশার চাদরে ঢাকা ভোর, খেজুরের রসের হাঁড়ি ঝুলে থাকা গাছ, উঠোনে জ্বলা আগুন আর তার পাশে বসে পিঠা বানানোর ব্যস্ততা। এই দৃশ্যগুলো একসময় ছিল গ্রামবাংলার শীতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীত কেবল হিমেল হাওয়ার চাদরে মোড়ানো শুকনো পাতার শব্দ নিয়ে আসত না; আসত উৎসব নিয়ে, সামাজিকতা নিয়ে, পারিবারিক মিলন নিয়ে। পিঠাপুলি ছিল সেই শীতের ভাষা, যার মাধ্যমে সনাতন গ্রামবাংলার মানুষ নিজের সংস্কৃতির পরিচয় জানাত, সম্পর্কগুলো আরও দৃঢ় হতো আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে যেত সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।

গ্রামবাংলার পিঠাপুলির ঐতিহ্য কোনো একক রেসিপির গল্প নয়। চালের গুঁড়া, নারকেল, খেজুরের গুড়, দুধ, সময় আর অনেকখানি ভালোবাসা–এই কয়েকটি উপাদান মিলেই তৈরি হতো বৈচিত্র্যের এক বিস্ময়কর ভান্ডার। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, দুধ চিতই, পাকন পিঠা, তেলের পিঠা, খোলাজা পিঠা, সরপুরি পিঠা কিংবা পুলি পিঠা– প্রতিটি পিঠার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত আলাদা আলাদা গল্প, আলাদা আলাদা অঞ্চল, আলাদা আলাদা মানুষের স্মৃতি। পিঠা বানানো কেবল রান্নার কাজ নয়, ছিল সামাজিক আয়োজন। প্রতিবেশীরা একে অন্যের বাড়িতে যেত, নতুন বউয়ের হাতের পিঠা দেখা হতো, শিশুদের উচ্ছ্বাসে উঠান ভরে উঠত।

শীতের এ উৎসবমুখর আবহ গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও তার প্রভাব শহরেও ছিল। একসময় শহরের বাসায় বাসায় গ্রাম থেকে গুড়, চালের গুঁড়া, নারকেল আসত। মায়েরা সময় বের করে পিঠা বানাতেন, আত্মীয়স্বজনের বাসায় পাঠানো হতো।

আজকের বাংলাদেশ এক দ্রুতগতির করপোরেট বাস্তবতায় অভ্যস্ত। শহরের জীবন চলে ক্যালেন্ডার আর ডেডলাইনের ছকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মিটিং, প্রেজেন্টেশন, টার্গেট আর পারফরম্যান্সের চাপে মানুষ ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। এই করপোরেট কালচারে শীত আসে ঠিকই, কিন্তু তার স্বাদ, তার গন্ধ, তার সামাজিকতা অনেকটাই হারিয়ে যায়। অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরে কেউ আর পিঠা বানানোর সময় বা মানসিকতা খুঁজে পায় না। ফ্রিজে রাখা ফ্রোজেন খাবার কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার করা ‘পিঠা’ দিয়েই অনেকের শীতকাল শেষ হয়ে যায়। শপিং মল, করপোরেট পিঠা উৎসব, ব্র্যান্ডেড স্টলে সাজানো পিঠা দেখতে ঝকঝকে, স্বাদেও হয়তো ভালো, কিন্তু সেখানে নেই সেই উঠানের উষ্ণতা, নেই সেই অপেক্ষা, নেই সেই সম্মিলিত শ্রমের আনন্দ।

গ্রামেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। তরুণ প্রজন্ম কাজের খোঁজে শহরমুখী, বয়স্করা একা হয়ে পড়ছেন। খেজুরের রস সংগ্রহ করা মানুষ কমে গেছে। গুড় বানানোর কষ্টকর প্রক্রিয়া অনেকেই এড়িয়ে চলছেন। ফলে পিঠার উপাদানই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। যে ঐতিহ্য একসময় ছিল স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ, তা এখন হয়ে উঠছে স্মৃতিচারণার বিষয়।
এই প্রেক্ষাপটে পিঠাপুলি শুধু খাবার নয়, হয়ে উঠেছে নস্টালজিয়ার প্রতীক। যারা শহরে বড় হয়েছেন বা করপোরেট জীবনে অভ্যস্ত, তাদের কাছে পিঠা মানে শৈশবের গ্রামে ফেরা, দাদি-নানির হাতের স্বাদ, শীতের সকালে কুয়াশাভেজা উঠান। সামাজিক মাধ্যমে পিঠার ছবি, শীতের স্মৃতিচারণা আসলে সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতি এক ধরনের আকুলতা প্রকাশ করে।

এই হারিয়ে যাওয়াকে মেনে নেওয়াই শেষ কথা নয়। শহর ও করপোরেট বাস্তবতার মধ্যেও পিঠাপুলির ঐতিহ্য নতুনভাবে জায়গা করে নিতে পারে, যদি আমরা তাকে কেবল পণ্য না ভেবে সংস্কৃতি হিসেবে দেখি। করপোরেট অফিসে এক দিনের পিঠা উৎসব যদি কেবল ব্র্যান্ডিংয়ের আয়োজন না হয়ে কর্মীদের পরিবার, শিকড় আর ইতিহাসের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর সুযোগ হয়, তাহলে তার তাৎপর্য ভিন্ন হতে পারে। স্কুল-কলেজে যদি পিঠাপুলির ইতিহাস ও বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা হয়, শিশুদের হাতে পিঠা বানানোর অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়, তাহলে ঐতিহ্য কেবল বইয়ে আটকে থাকবে না।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় গ্রামের দিকেও দৃষ্টি ফেরানো জরুরি। স্থানীয়ভাবে খেজুরের গুড় উৎপাদন, শহরভিত্তিক পিঠা বানানোর প্রশিক্ষণ, গ্রামভিত্তিক শীতকালীন উৎসব টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া গেলে পিঠাপুলি আবার সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। এতে শুধু সংস্কৃতি রক্ষা হবে না, গ্রামীণ অর্থনীতিরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

বাংলাদেশে শীত এখনও আসে, কুয়াশা এখনও নামে; কিন্তু আমরা কি সেই শীতকে অনুভব করার সময় রাখছি। করপোরেট জীবনের ব্যস্ততায় যদি আমরা এক মুহূর্ত থেমে পিঠার ভাপ, গুড়ের গন্ধ আর শীতের গল্পগুলোকে জায়গা দিই, তাহলে হয়তো হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য পুরোপুরি হারাবে না। পিঠাপুলি তখন শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না, বর্তমানের মধ্যেই তার নতুন জীবন খুঁজে পাবে।

রাজু আলীম: কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com