|
ওসমান হাদি
|
|
|---|---|
| ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র | |
| কাজের মেয়াদ ১৩ আগস্ট ২০২৪ – ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ |
|
| সদস্য সচিব | আব্দুল্লাহ আল জাবের |
| পূর্বসূরী | পদ প্রতিষ্ঠিত |
| উত্তরসূরী | ঘোষণা করা হবে |
| ব্যক্তিগত বিবরণ | |
| জন্ম | ওসমান গনি ৩০ জুন ১৯৯৩[১] নলছিটি, ঝালকাঠি জেলা, বাংলাদেশ |
| মৃত্যু | ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ (বয়স ৩২) সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল, সিঙ্গাপুর |
| মৃত্যুর কারণ | হত্যাকাণ্ড (গুলিবিদ্ধ) |
| সমাধিস্থল | কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধ, ঢাকা |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশী |
| প্রাক্তন শিক্ষার্থী | |
| পেশা | রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক এবং শিক্ষক |
| যে জন্য পরিচিত | |
শরীফ ওসমান বিন হাদি বা ওসমান হাদি (৩০ জুন ১৯৯৩ – ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫)[১] ছিলেন একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক ও শিক্ষক, যিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত।[২][৩] তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। হাদি জুলাই শহিদদের অধিকার রক্ষা ও আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সক্রিয় রাজনীতির জন্য আলোচনায় আসেন।[৪][৫][৬]
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন[৭] এবং ১৮ ডিসেম্বর রাত ০৯:৩০ টায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।[৮]
ওসমান হাদি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শরীফ আব্দুল হাদি, যিনি একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম ছিলেন। ৬ ভাইবোনের (৩ ভাই, ৩ বোন) মধ্যে হাদি সর্বকনিষ্ঠ।[৯] হাদির বড় ভাইয়ের নাম আবু বকর সিদ্দিক ও মেজো ভাইয়ের নাম ওমর ফারুক। হাদি তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে, সেখান থেকে তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। চতুর্থ শ্রেণিতে তিনি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন, সেখানে তিনি আলিম (এইচএসসি) সম্পন্ন করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।[১০]
হাদি ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স নামক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেন।[১১][১০]
হাদি ঢাকার রামপুরা এলাকায় বসবাস করতে শুরু করেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে হওয়া আন্দোলনে হাদিকে অন্যতম তরুণ নেতৃত্বদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[১২]
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গঠিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ শরিফ ওসমান হাদির হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়।[২] সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং “ইনসাফভিত্তিক” একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন, যেখানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার প্রধান মূল্যবোধ হিসেবে থাকবে।[২]
ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষা, অপরাধীদের বিচার, আহত-নিহত ব্যক্তিদের স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি তুলেন হাদি। যা তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে “ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি” ব্যানারের অধীনে যে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানে ইনকিলাব মঞ্চ অন্যতম অংশগ্রহণকারী সংগঠন হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।[১২] ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে হাদি আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলে ধরেন এবং দাবি না মানলে সচিবালয় ঘেরাওয়ের হুমকি দেন।[১৩]
১৪-১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে এই ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। বিচার চাই না ফাঁসি চাই বলে হাজার হাজার আয়নাঘর কায়েম করা হয়। রোজা ভাঙিয়ে আমার বোনকে ধর্ষণ করা হয়। বাংলাদেশে বেগম জিয়ার বিনা চিকিৎসায় হাত বাঁকা করে ফেলা হয়েছে। আল্লামা সাঈদীকে মেডিক্যালে চিকিৎসার নামে এখানে এনে হত্যা করা হয়। মোশতাককে জেলের মধ্যে হত্যা করা হয়। মাইকেল চাকমার জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সর্বশেষ হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে আমাদের ভাই-বোনদের কলিজা ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়। সেই টার্মকে বৈধতাই শুধু নয় অপরিহার্য জরুরত হিসেবে প্রমাণ করেছে এই শাহবাগ।
— ওসমান হাদি, [১৪]
অন্যান্য বক্তব্যগুলোতে হাদি নিজেকে ও তার সংগঠনকে “ফ্যাসিবাদের” আপসহীন বিরোধীশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তি দেন যে জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদের উচিত আওয়ামী লীগকে আবার রাজনৈতিক বৈধতা ফিরে পেতে না দেওয়া।[১৫]
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ঘোষণা দিলে ওসমান হাদি ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে দল ও ব্যক্তির বিচার করার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিরাপরাধ কর্মীদের প্রায়শ্চিত্তের জন্য কমিশন গঠন এবং ৫ আগস্ট ২০২৫ সালের মধ্যে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার প্রস্তাব দেন।[১৬]
২০২৫ সালের ২৪ মে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ইনকিলাব মঞ্চ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ওসমানি হাদি জাতীয় সরকার গঠনের দাবি করেন।[১৭] তিনি বলেন, “আমরা আবারও জাতীয় সরকারের দাবি করছি; যেখানে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন থেকে শুরু করে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে নিয়ে জাতীয় সরকার করতে হবে।”[১৮]
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শরিফ ওসমান হাদি বলেন, বিএনপি যদি “পুরনো ধারায়” রাজনীতি করে ক্ষমতায় আসে, তবে তারা দুই বছরও ক্ষমতায় টিকতে পারবে না।[১৯][২০] তিনি সেখানে জনগণকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সতর্ক করেন যে শুধু সংসদে বসে “দেশবিরোধী আইন” করলে জনগণ তা মেনে নেবে না।[১৯]
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দৃশ্যমান পরিবর্তনের ঘাটতির সমালোচনা করে হাদি সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন।[২১][২২][২৩]
২০২৫ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত) থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন শরিফ ওসমান হাদি।[২][২৪] মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত এই আসনে তিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় ও “চা-সিঙ্গারা” আড্ডার আয়োজনের কথা জানান। এছাড়া তিনি জনগণের পরামর্শ অনুযায়ী তার নির্বাচনি ইশতাহার ঠিক করবেন বলে ঘোষণা দেন। তার এই ভিন্নধর্মী প্রচারণা নাগরিক সমাজে ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং গণমাধ্যমে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়।।[২][২৫][২৬][২৭]
নির্বাচনি প্রচারণায় কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে মুড়ি-বাতাসা বিতরণের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। এছাড়া ভোররাতে মসজিদের সামনে লিফলেট বিতরণ, ডোনেশনের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং সংগৃহীত অর্থের হিসাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করায় তার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি নির্বাচনি প্রচারণার সময় ওসমান হাদির পকেটে একজন টাকা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়।[২৮]
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শরিফ ওসমান হাদি মন্তব্য করেন যে এই রায় “পুরো পৃথিবীর জন্য নজির স্থাপন করেছে” এবং কোনো স্বৈরাচার দীর্ঘকাল মানুষের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যেতে পারে না।[৫][২৯]
হাদি বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে হাদির বিভিন্ন বক্তব্যে যা প্রকাশ পায়। হাদি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামকে অন্তর্নিহিতভাবে বহিরাগত আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়া হিসেবে উল্লেখ করেন, বিশেষ করে ভারত থেকে, যাকে তিনি “ভারতীয় আধিপত্য” হিসাবে আখ্যা দেন। তার মতে, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই নয়াদিল্লির কৌশলগত সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এ কারণে তিনি এই প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি “প্রজন্মগত বিচ্ছেদ”-এর পক্ষে মত দেন।
হাদির নেতৃত্বে ইনকিলাব মঞ্চ আওয়ামী লীগকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে প্রচারণা চালায় এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো পুনর্গঠনের দাবি তোলে। এর লক্ষ্য ছিল, “ন্যায়ভিত্তিক সার্বভৌমত্ব” (ইনসাফ) নিশ্চিত করা।[৩০] তার আন্দোলনে প্রায়ই জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করা হতো, যার মাধ্যমে তিনি ভারতের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের আহ্বান জানাতেন। এক পর্যায়ে হাদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনায় আসেন। তিনি ফেসবুকে “বৃহত্তর বাংলাদেশ” নিয়ে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।[৩১] তার এই কাজ ভারতীয় কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তার হত্যাকাণ্ডের পর, তার উত্তরাধিকার নতুন করে ভারতবিরোধী মনোভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তার সমর্থকেরা তাকে “সার্বভৌমত্বের জন্য শহীদ” হিসেবে অভিহিত করেন।[৩২]
ওসমান হাদি শিল্প-সাহিত্য, পাঠচক্র এবং অন্যান্য কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। তিনি সীমান্ত শরিফ ছদ্মনামে ২০২৪ সালের একুশে বইমেলায় দুয়ার প্রকাশনী থেকে লাভায় লালশাক পুবের আকাশ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।[৩৩][৩৪][৩৫][৩৬]
২০২৫ সালে জাতীয় নাগরিক পার্টির ডাকা মার্চ টু গোপালগঞ্জ ক্যাম্পেইনে সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে তিনি গোপালগঞ্জ জেলা ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গালিগালাজপূর্ণ ভাষায় তীব্র সমালোচনা করেন, যা ব্যাপক সমালোচনা ও আলোড়নের সৃষ্টি করে।[৩৭] পরবর্তীকালে বিতর্কের মুখে তিনি তার গালিকে মুক্তির মহাকাব্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং কেউ দুঃখ পেয়ে থাকলে তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।[৩৮]
ওসমান হাদি বিবাহিত ছিলেন এবং তার একমাত্র ছেলে সন্তানের নাম ফিরনাস বিন ওসমান।[৯]

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, প্রায় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে, মসজিদ থেকে ফেরার সময় রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় হাদি গুলিবিদ্ধ হন। মোটরসাইকেলে করে আসা হামলাকারীরা হাদির মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায়।[৩৯][৭] এর আগে হাদি ২০২৫ সালের নভেম্বরে জানিয়েছিলেন যে তিনি ফোনকল ও বার্তার মাধ্যমে মৃত্যু-হুমকি পাচ্ছেন।[৪০][৪১][৪২]
এই হামলার পর হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।[৪৩] এরপর তাকে হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি কোমায় ছিলেন, তার জিসিএস স্কোর ছিল ৩, এবং তিনি মাইড্রিয়াসিসে ভুগেন। এরপর হাদিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।[৪৪] ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে নেওয়া হয়।[৪৫]
এই ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখকে শনাক্ত করে, যারা দুজনই আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। এছাড়া হামলার আগে হাদির ওপর নজরদারিতে রুবেল নামে আরেক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন বলে জানানো হয়। পুলিশ জানায়, হাদিকে গুলি করেন ফয়সাল করিম মাসুদ এবং মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন আলমগীর শেখ।[৪৬] হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সহায়ক তথ্যের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।[৪৭] ১৫ ডিসেম্বর সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের জানান, এক হামলাকারী সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে গিয়েছে।[৪৮] পুলিশ নারায়ণগঞ্জ থেকে ফয়সালের সহযোগী দাঁতভাঙ্গা কবিরকে আটক করে।[৪৯] ফয়সালের স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবীকেও আটক করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।[৫০]

হাদি টানা ৭ দিন মৃত্যুশয্যায় থাকার পর ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।[৮][৫১][৫২] তার মৃত্যুতে, বাংলাদেশ সরকার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং তার পরিবারের দায়িত্ব সরকার নিবে বলে জানায়।[৫৩][৫৪] হাদির পরিবারের মতে তিনি নিজের বাবার কবরের পাশে সমাহিত হতে চেয়েছিলেন।[৫৫] ২০ ডিসেম্বর মানিক মিয়া এভিনিউতে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত তার জানাজায় কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে, জানাজার পর তাকে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা হয়।[৫৬]
ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জনপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের একাধিক শহরে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করে। বিক্ষোভকারীরা হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, প্রতীকী জানাজা, দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভাও অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচির ফলে কিছু এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থান নেয় এবং সংশ্লিষ্ট মহল থেকে সংযম ও শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।[৫৭][৫৮]

ওসমান হাদির মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস জরুরি ভাষণ দিয়ে তার মৃত্যুর খবর দেশবাসীকে জানান এবং সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তার মৃত্যুতে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন এবং সরকার তার পরিবারের দায়িত্ব নেয়।
ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদী বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজধানীতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, শাহবাগে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় এবং দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার অফিস-সহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে। [৬৬][৬৭][৬৮]
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপি, এই হত্যাকাণ্ডকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করে।[৬৯][৭০] অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সেইসঙ্গে, কোনো ধরনের ‘অপপ্রচার ও গুজবে’ কান না দেওয়া এবং হঠকারীমূলক সিদ্ধান্ত না নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।[৭১]