আজকের অস্থির সমাজ ও বিচলিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। কারণ আজকের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বত্র দেওয়া যায় আইনের ব্যত্যয়, সামাজিক বিশৃঙ্খলা আর অসহিষ্ণুতা।
পবিত্র কোরআন স্পষ্টভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়ে বলে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর ও আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের।
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)
এই আয়াত রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার প্রতি একজন মুসলিমের অবস্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখানে ‘কর্তৃত্বের অধিকারী’ বলতে শাসক, প্রশাসন ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষ বোঝানো হয়েছে; যতক্ষণ তারা আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশের বিরোধিতা না করে ততক্ষণ তাদের আনুগত্য আবশ্যক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যতক্ষণ আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ দেওয়া না হয়, ততক্ষণ পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় সব বিষয়ে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শাসকের মান্যতা ও আনুগত্য করা কর্তব্য।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১৪৪)
এ হাদিস রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় আনুগত্যের সীমা ও ভারসাম্য দুটোই নির্ধারণ করে দিয়েছে।
অনেকেই রাষ্ট্রীয় আইন মানাকে শুধু প্রশাসনিক বিষয় মনে করেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে আইন মানা ঈমানেরই একটি দাবি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪০)
এ নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত নয়; সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা, সরকারি সম্পদ নষ্ট করা, কর ফাঁকি দেওয়া, ঘুষের লেনদেন; এসব শুধু নাগরিক অপরাধই নয়; বরং আমানতেরও বড় খেয়ানত।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ, আইন ও কর্তব্য এর সবই আমানতের অন্তর্ভুক্ত।
ইসলাম কখনো বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকে সমর্থন করেনি। পবিত্র কোরআনে বারবার ফাসাদ বা অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি কোরো না, যখন তা সংশোধিত করা হয়েছে।’
(সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ৫৬)
রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ভেঙে দেওয়া, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, সহিংসতা উসকে দেওয়া; এর সবই ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী।
রাসুল (সা.) মদিনা রাষ্ট্র গঠনের সময় মুসলিম ও অমুসলিম সবার জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন। যা ‘মিসাকুল মদিনা বা মদিনা সনদ’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে নাগরিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা কতটা গুরুত্ব বহন করে।
তবে ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকার শিক্ষাও দেয় না; কিন্তু তা হতে হবে দায়িত্বশীল ও শালীন পদ্ধতিতে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো জালিম শাসকের সামনে ন্যায় কথা বলা।’ (আবু দাউদ, হাদিস :৪৩৪৪)
এ হাদিস প্রমাণ করে যে ইসলাম প্রতিবাদ করতে বলে; কিন্তু তা হতে হবে সুশৃঙ্খলভাবে; নৈতিকতা ও শালীনতার সঙ্গে।
কাজেই প্রমাণিতভাবেই বোঝা গেল যে একজন মুসলিম নাগরিকের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিগত ধার্মিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। তার নামাজ, রোজা, দোয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষা, আইন মানা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন—সবই ঈমানের দাবি।
রাষ্ট্র যদি শৃঙ্খলাহীন হয়ে যায়, তার দায় শুধু শাসকের নয়; নাগরিক হিসেবে আমাদেরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ইসলাম আমাদের শেখায়; একটি শক্ত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল নাগরিকের হাত ধরেই।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে শান্তিময় আর কল্যাণময় রাষ্ট্র বিনির্মাণে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভুমিকা পালন করার তাওফিক দান করুন।