মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:২১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সুন্দরবনের নোনাজলের তলদেশে লুকানো মিঠাপানির ভান্ডার

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

খুলনা ও সুন্দরবন এলাকার পুরো ভূপ্রকৃতি গ্রাস করেছে নোনাজল। লবণাক্ত নদী, ফাটল ধরা মাটি, আর্সেনিকে দূষিত নলকূপ– সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ বছরের অধিকাংশ সময়ই নিরাপদ পানির সংকটে ভোগে। অনেক পরিবারকে কিনে খেতে হয় মিঠাপানি।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক একদল গবেষকের অনুসন্ধান উপকূলে আলোর রেখা ফেলেছে। গবেষকরা বলছেন, মাটির বহু গভীরে লুকিয়ে আছে দুটি বিশাল মিঠাপানির আধার। হাজার বছরের পুরোনো সেই পানি আজও প্রায় অক্ষত। নতুন এই আবিষ্কার আশা জাগাচ্ছে, উপকূলের গভীরে এখনও লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা। লবণাক্ততায় ধুঁকতে থাকা এই অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা টেকসইভাবে ব্যবহারের পথ খুঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কেন এই গবেষণা
উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির অগভীর স্তর পুরোপুরি লবণাক্ত। আর্সেনিক দূষণ আবার অগভীর মিঠাপানির ব্যবহারকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ ছিল, আরও গভীরে কি নিরাপদ পানি মজুত থাকতে পারে?

এই প্রশ্ন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ মেক্সিকো ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিপ ব্লু জিওফিজিক্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পশুর নদীর তীর বরাবর ১২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভূগর্ভের গঠন অনুসন্ধান করেন। তারা ব্যবহার করেন আধুনিক ভূ-তড়িৎ-চৌম্বকীয় পদ্ধতি, ম্যাগনেটোটেলুরিক। এই প্রযুক্তি মাটির গভীরে লবণাক্ত ও মিঠাপানির বৈদ্যুতিক রোধের পার্থক্য ধরে ফেলতে পারে। গবেষণাটি গত শুক্রবার বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত হয়।

কী পাওয়া গেল
গবেষকরা দেখেছেন, খুলনার উত্তরের অংশে ২০০ থেকে ৮০০ মিটার গভীরে বিস্তৃত আছে বিশাল এক মিঠাপানির স্তর। এটি প্রায় ৪০ কিলোমিটার বিস্তৃত এবং পানির লবণাক্ততা এত কম যে, সরাসরি মিঠাপানি হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই পানি তৈরি হয়েছিল শেষ বরফযুগে, যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ আজকের চেয়ে প্রায় ১২০ মিটার নিচে ছিল। নদীগুলো গভীর উপত্যকা তৈরি করে সমুদ্রের দিকে ছুটে যেত। সেই বালুমিশ্রিত নদীপথে প্রবেশ করা বৃষ্টির পানি হাজার বছর ধরে ভূগর্ভে সঞ্চিত থাকত।

সুন্দরবনের ভেতরে পাওয়া গেছে দ্বিতীয় আরেকটি মিঠাপানির ভান্ডার। এটি আকারে তুলনামূলক ছোট, গভীরতাও কম। কিন্তু লবণাক্ততার মাত্রা এতটাই নিচে যে, এ অঞ্চলেও নিরাপদ পানির আরেকটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এই দুটি ভান্ডারের মাঝখানে আছে একটি প্রশস্ত লবণাক্ত পানির স্তর, যা গঙ্গার প্রাচীন নদী খাত ভরাটের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। বরফযুগের পর সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়তে শুরু করলে এই এলাকাগুলো লবণাক্ত কাদামাটিতে ঢেকে যায়। এখন তা স্থায়ী লবণাক্ত স্তর হিসেবে ভূগর্ভে রয়ে গেছে।

গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে, ওপরে নোনাজল আর নিচে মিঠাপানির এত দীর্ঘ স্থায়িত্বের রহস্য লুকিয়ে আছে এলজিএমপি বা লাস্ট গ্লেশিয়াল ম্যাক্সিমাম প্যালেসল নামের এক প্রাচীন কাদামাটি স্তরে। বরফযুগ শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠ দ্রুত বাড়ার সময় উপকূলীয় জমিগুলো ঢেকে যায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম দানার কাদামাটি ও শিলাস্তরে। এই স্তর ওপরের লবণাক্ত পানিকে নিচে নামতে দেয়নি। ফলে হাজার বছর আগের মিঠাপানি আজও অক্ষত।

গবেষকরা বলছেন, এখন জরুরি হলো গভীর পরীক্ষামূলক কূপ খনন করে তথ্য নিশ্চিত করা, বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা এবং কোথা থেকে কত গভীর থেকে পানি তোলা যায়, তার বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা নির্ধারণ করা। পাশাপাশি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে– বর্ষার পানি ধরে রাখা, খাল-পুকুর পুনঃখনন, লবণাক্ততার বিস্তার ঠেকানো এবং গভীর পানি শুধু পানীয় জলের জন্য সংরক্ষণ করা।

সংগৃহীত তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, ভূগর্ভের গভীরে দুটি মিঠাপানির আধার রয়েছে, এ দুটির মাঝখানে রয়েছে উচ্চ লবণাক্ত একটি অঞ্চল। গবেষকরা লিখেছেন, আমরা মনে করি– শেষ বরফযুগের সর্বোচ্চ বরফ আবরণকালে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ অনেক নিচু ছিল, তখনই এসব গভীর মিঠাপানির আধার তৈরি হয়। এরপর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওপরের সূক্ষ্ম দানার পলিমাটি এই পানির স্তরকে ঢেকে নিচে ফেলে, তবে এগুলো এখনও সুরক্ষিত আছে। বিপরীতে গঙ্গার প্রাচীন প্রবাহের দুই পাশের এলাকা, পরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা ভূখণ্ডের দিকে আরও এগিয়ে আসা এবং নতুন পলিমাটির সঞ্চয়ই মাঝের লবণাক্ত অঞ্চলের জন্ম দিয়েছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, তারা যে পানি মজুতের কথা বলছেন, তা ৯০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে পাওয়া যেতে পারে। তাদের ধারণা, এসব ভূগর্ভস্থ জলাধার সম্ভবত প্লাইস্টোসিন বা আরও পুরোনোকালে তৈরি হয়েছিল। সর্বশেষ বরফযুগে এসব জলাধার বর্তমান সময়ের সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে প্রায় ১২০ মিটার নিচে ছিল।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জলাধার দুটি আসলে শেষ বরফযুগে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আরও নিচে থাকার সময় গঠিত মিঠাপানির আধার। সে সময় উপকূলরেখা ছিল অনেক দূরে। এরপর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে সূক্ষ্ম দানার পলি পড়ে জলাধারগুলো ঢেকে যায়। এর সঙ্গে তৈরি হয় অপ্রবেশযোগ্য কাদামাটির স্তর। যার ফলে, এসব জলাধারের ওপরের লবণাক্ত পানি নিচে ঢুকতে বাধা পায়। ফলে ভূগর্ভের গভীরে মিঠাপানির স্তরগুলো হাজার হাজার বছর ধরে অক্ষত আছে।

কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ
উপকূলীলের মানুষ দীর্ঘদিন পানির নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করছে। লবণাক্ততার বিস্তার, খরা, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া– সব মিলিয়ে পানির সংকট এখন জীবিকা, স্বাস্থ্য, কৃষিতে আঘাত করছে। এই দুটি গভীর মিঠাপানির ভান্ডারের অস্তিত্ব প্রমাণ করে, উপকূলের নিচে ধারণার চেয়েও বড় সম্ভাবনা আছে। তবে এখানেই বড় প্রশ্ন– এই পানি কি ব্যবহার করা যাবে, গেলে কীভাবে, আর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট না করে কতটা উত্তোলন করা সম্ভব?

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এখনই পানি তুলতে গেলে পুরো সিস্টেমটাই ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ এই পানি কয়েক হাজার বছর ধরে সেখানে আছে; দ্রুত ফের ভরাট হওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই পানির যে কোনো ব্যবহার নিয়ে ভাবতে হবে বিজ্ঞান, পরিবেশবিদ ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে।

সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্য সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এই আবিষ্কার উপকূলীয় বাংলাদেশের ভূগর্ভে মিঠাপানি ও লবণাক্ত পানির বিন্যাস সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেয়। এমটি মডেল ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের উপযোগী স্থান নির্ধারণে সহায়ক হবে এবং পানি ব্যবস্থাপনায় টেকসই পাম্পিং সীমা নির্ধারণেও সাহায্য করবে। যেখানে নোনাজলঘেরা জীবনই নিয়তি, সেখানে মাটির গভীরে হাজার বছরের পুরোনো মিঠাপানির এই গোপন ভান্ডার মানুষের জন্য সত্যিকারের আশার বার্তা। তবে সেই আলো জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় মানুষের।

সুন্দরবনবিষয়ক লেখক ও গবেষক ইসমে আজম বিজ্ঞানীদের নতুন দাবির গুরুত্ব আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, সুন্দরবনে প্যালিও ওয়াটারের দুটি উৎস পাওয়া গেছে। প্যালিও ওয়াটার হলো প্রাচীন ভূগর্ভস্থ জল, যা হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আটকে থাকে। এটি প্রাচীন সুন্দরবনের বয়স ও গঠনের ধারণাকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com