ভূমিকম্প কি আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব? এমন কোনো ‘গোপন প্রযুক্তি’ কি আছে, যা কেবল সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে? এ প্রশ্নগুলো আমাদের সবার মনেই উঁকি দেয়, বিশেষ করে যখন আমরা ভাবি, একটি বড় ভূমিকম্প হলে আমাদের প্রিয় শহর ঢাকার কী হবে। বিশেষজ্ঞরা অনেকদিন ধরেই সতর্ক করছেন, ঢাকা একটি ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমার ওপর বসে আছে। একটি বড় ঝাঁকুনিতেই এ শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।
‘গোপন প্রযুক্তি’র পেছনের কথা
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্প নিয়ে তিন ধরনের কথা বলেন, যা আমরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলি।
১. পূর্বাভাস: নির্দিষ্ট করে বলা ঠিক কবে, কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপসহ বিশ্বের শীর্ষ বিজ্ঞানীরা একমত, এটি বর্তমানে প্রায় অসম্ভব–তবে তা ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভব হতেও পারে।
২. সম্ভাবনা: এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কথা। যেমন ‘আগামী ৫০ বছরে এই অঞ্চলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের ৩০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে।’ এটি বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব।
৩. আর্লি ওয়ার্নিং: এটি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এটি হলো ভূমিকম্প শুরু হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সতর্কবার্তা। ভূমিকম্পের কম ক্ষতিকর ‘পি-ওয়েভ’ শনাক্ত করে এ সিস্টেমটি একটি সংকেত পাঠায়, যা মূল ধ্বংসাত্মক ‘এস-ওয়েভ’ পৌঁছানোর কয়েক সেকেন্ড থেকে মিনিটখানেক আগে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘হার্প’ নামক একটি গবেষণা প্রকল্পকে প্রায়ই ভূমিকম্প সৃষ্টির জন্য দায়ী করা হয়; যা বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এটি আবহাওয়া নিয়ে গবেষণার একটি প্রকল্প মাত্র। সামরিক বাহিনী ভূমিকম্প-সম্পর্কিত যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তা ভূমিকম্পের আগে নয়, বরং পরে ব্যবহারের জন্য। যেমন ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের স্পন্দন খোঁজার জন্য বিশেষ সেন্সর।
তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞানীরা বসে আছেন। আসল যুগান্তকারী গবেষণা চলছে এবং তা মোটেই গোপন নয়। এ নতুন প্রযুক্তি দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্যাটেলাইট।
বিজ্ঞানীরা এআই-কে পৃথিবীর ভেতরের কোলাহল বা ‘নয়েজ’ শুনতে শেখাচ্ছেন। মাটির নিচের লাখ লাখ ক্ষুদ্র কম্পনের মধ্যে এআই এমন সব সূক্ষ্ম প্যাটার্ন খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, যা মানুষের পক্ষে ধরা অসম্ভব। সম্প্রতি চীনের একটি পরীক্ষায় একটি এআই মডেল পাঁচ বছরের ডেটা বিশ্লেষণ করে এক সপ্তাহ আগে ৭০ শতাংশ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে এটি কিছু ভুল সতর্কবার্তাও দিয়েছে। তাই এটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে।
বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেখছেন, বড় ভূমিকম্পের আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের একেবারে ওপরের স্তরে (আয়নোস্ফিয়ার) কিছু বৈদ্যুতিক পরিবর্তন দেখা যায়। মাটির নিচের প্রচণ্ড চাপ এই পরিবর্তনটি ঘটায় বলে ধারণা করা হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ভূমিকম্প হওয়ার আগে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।
এ নতুন প্রযুক্তিগুলো খুবই আশাব্যঞ্জক, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এখনই কোনো সমাধান নয়। এর প্রধান কারণ, এই এআই সিস্টেমগুলো ‘ডেটা-ক্ষুধার্ত’। এদের কাজ করতে গেলে কয়েক দশক ধরে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ সিসমিক ডেটা বা তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে ভূমিকম্প মাপার সেন্সরের নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি ‘ডেটা মরুভূমি’–যার মানে, আমাদের এ সম্পর্কিত আগের কোনো গবেষণা বা সংরক্ষিত তথ্যের ডেটাবেজ নেই। অথচ ঢাকা শহরটি দাঁড়িয়ে আছে নরম বালি মাটির ওপর। ভূমিকম্পের সময় এ মাটি ‘জেলের মতো’ আচরণ করবে, যাকে বলে ‘লিকুইফ্যাকশন’। অর্থাৎ শক্ত মাটি মুহূর্তেই তরল কাদায় পরিণত হয়ে দালানগুলোকে গিলে ফেলবে।
এটি তিনটি প্রমাণিত প্রযুক্তির একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ঢাকাকে বাঁচাতে পারে।
১. ৩০ সেকেন্ডের জীবন রক্ষাকারী সংকেত: অবিলম্বে দেশজুড়ে ‘আর্থকোয়াক আর্লি ওয়ার্নিং’ সিস্টেম বসাতে হবে। জাপান, মেক্সিকোর মতো দেশগুলো এটি ব্যবহার করে। ভূমিকম্প শুরু হওয়ামাত্র এ সিস্টেম ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট সময় দেবে।
২. ‘ধ্বংসস্তূপ’ ঠেকানোর প্রযুক্তি: এটিই একমাত্র উপায়, যা ঢাকাকে ধ্বংসস্তূপ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। একে বলে ‘সিসমিক রেট্রোফিটিং’ বা পুরোনো ভবনকে ভূমিকম্প-সহনশীল করে তোলা।
৩. মানবিক ‘সফটওয়্যার’ বা অনুশীলন: আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের সংকেত পেলেই মানুষ যদি আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে, তবে পদদলিত হয়েই অনেকে মারা যাবে। জাপানেও এমন ঘটনা দেখা গেছে। এর একমাত্র সমাধান হলো নিয়মিত গণমহড়া। ঠিক যেভাবে আমরা ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পেলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাই, সেভাবেই ভূমিকম্পের সংকেতে ‘ড্রপ, কভার, হোল্ড অন’ অভ্যাসটিকে আমাদের দ্বিতীয় স্বভাবে পরিণত করতে হবে।