পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আর তিনি পৃথিবীকে জীবজগতের জন্য স্থাপন করেছেন।’
(সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ১০)
এ আয়াত আমাদের জানিয়ে দেয় যে পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, এটি সব প্রাণীর সম্মিলিত আবাসস্থল।প্রতিটি পোকা-মাকড়, গাছপালা, পশুপাখি—সবই এই সৃষ্টির পরিপূর্ণ ভারসাম্যের অংশ। মানুষ যদি অহেতুক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তবে সে আল্লাহর নির্ধারিত ভারসাম্য নষ্ট করছে।অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর তাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বাধিক পরিবেশ সচেতন মানব। তিনি বলেছেন, ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হতে থাকে, আর তোমার হাতে কোনো খেজুরগাছের চারা থাকে, তবে সেটি রোপণ করে ফেলো।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১২৯০২)
কিয়ামতের মতো ভয়ংকর মুহূর্তেও গাছ লাগানোর নির্দেশ এ কথাই প্রমাণ করে যে ইসলাম জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত থাকতে আহবান জানায়।
আরেক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি গাছ রোপণ করে এবং তাতে মানুষ বা প্রাণী আহার করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।
অতএব, বন্যপ্রাণী রক্ষা ও প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা ইসলামী নৈতিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুসলিম স্কলারদের দৃষ্টিতে পরিবেশ
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) লিখেছেন, ‘আল্লাহর সৃষ্ট জগতের প্রতিটি কণায় তাঁর প্রশংসা প্রতিফলিত হয়; যে প্রকৃতিকে অবহেলা করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নিদর্শনকে অবমাননা করে।’
(মিফতাহু দারিস সাআদাহ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৮৮-৮৯)
ইমাম গাজালী (রহ.) লিখেছেন, ‘মানুষ পৃথিবীর আমানতদার, সে যদি এই আমানতের অপচয় করে, তবে কিয়ামতের দিন তাকে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।’ (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, কিতাবুত তাওাক্কুল, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৩৮-২৩৯)
এই আমানতের অর্থই হলো প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, সম্পদের মিতব্যয়ী ব্যবহার এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা।
ইবাদতের বিস্তৃত দিগন্ত
আমরা সাধারণত ইবাদতকে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতে সীমাবদ্ধ মনে করি। কিন্তু ইসলাম ইবাদতের পরিধি এতটাই বিস্তৃত করেছে যে মানবসেবার প্রতিটি কাজ এবং প্রকৃতির যত্নের প্রতিটি প্রয়াসও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।’ (সুরা : আজ-জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)
যেহেতু মানুষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর নির্দেশ মানার জন্য সৃষ্টি, তাই প্রকৃতির যত্ন নেওয়া, অপচয় পরিহার করা, জল সংরক্ষণ করা—সবই ইবাদতের পরিধির মধ্যে পড়ে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘পানি ব্যবহারে অপচয় কোরো না, যদিও তুমি প্রবহমান নদীর ধারে থাকো।’
(ইবন মাজাহ, হাদিস : ৪২৫)
এই হাদিস পরিবেশ সচেতনতার এমন এক নৈতিক মানদণ্ড শিখিয়েছে, যা আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানও এখন স্বীকার করছে।
আমরা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহভীরু হই, তবে বৃক্ষরোপণ, দূষণ প্রতিরোধ, পানি ও বাতাসের সংরক্ষণ—সব কিছুই আমাদের নিত্য ইবাদতের অংশ হয়ে উঠবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সৃষ্টির নিপুণ সৌন্দর্য রক্ষা
করে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হওয়ার তাওফিক দান করুন।