আমরা কেউ দেখিনি সেটি, পড়িনি তখন, কিন্তু কী আছে তাতে জানা হয়ে গিয়েছিল লোকের মুখে মুখে। রাজবন্দির জবানবন্দি আমরা আরো পড়েছি। কাজী নজরুল ইসলামের জবানবন্দিটি অসাধারণ; ওইতো সেদিন ফাঁসির আরেক আসামি, কর্নেল তাহেরের জবানবন্দি পড়লাম, বিশ্বাসের ও সাহসের এক আশ্চর্য দলিল।
ইলা মিত্রের জবানবন্দি সেদিক থেকে একেবারেই সাদামাটা। সাহিত্যিক সৌন্দর্য বলতে এতে কিছুই নেই।একেবারেই সহজ-সরল বিবরণ একটি। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে একটি স্বীকারোক্তি আদায় করতে চেয়েছিল এই মর্মে যে তিনি পুলিশ খুন করেছেন। ঘটনা এই যে নাচোল থানার ভারপ্রাপ্ত দারোগা তিনজন পুলিশ নিয়ে একটি গ্রামে গিয়েছিলেন টহল দেওয়ার ও সালামি আদায়ের জন্য। ওই অঞ্চলে তখন তেভাগা আন্দোলন উঠেছে তুঙ্গে, ইলা মিত্র নেত্রী সে আন্দোলনের। পুলিশের ওই দলটি নির্যাতন করেছিল গ্রামবাসীকে, তখন তারই প্রতিক্রিয়ায় তীর-বল্লম নিয়ে শত শত সাঁওতাল কৃষক ঘিরে ফেলেন পুলিশকে। পুলিশ গুলি ছোড়ে। কৃষকরা হতাহত হন। এতে উত্তেজনা আরো বাড়ে। পরিণামে পুলিশের দলটি নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে শুরু হয়ে যায় তাণ্ডব। সব এলাকা ঘিরে ফেলা হয়। নির্বিচারে হত্যা করা হয় মানুষকে। কমপক্ষে ১৫০ জন নিহত হয় গুলিতে। গ্রেপ্তার করা হয় বহু মানুষকে। ইলা মিত্রকেও। পুলিশ স্বীকারোক্তি চেয়েছিল তাঁর কাছে। তিনি রাজি হননি। তার পরেই অত্যাচার। সে অত্যাচারের কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। এর যে বিবরণ দিয়েছেন ইলা মিত্র, তাতে কল্পনার জন্য কোনো জায়গাই ছিল না আসলে।মানুষ কতটা অমানুষ হতে পারে তার বহু প্রমাণ আমরা একাত্তরে দেখেছি। কিন্তু সেটি পাঞ্জাবিরা করেছিল। ইলা মিত্রের নির্যাতনকারীরা কেউই পাঞ্জাবি ছিল না, সবাই বাঙালি এবং তখন কোনো যুদ্ধও চলছিল না, ঠাণ্ডা মাথায়, বুঝেসুজে অত্যাচার করেছে। কার ওপর? তাঁর পরিচয় তারা জানত। চোর নয়, ডাকাত নয়, একজন রাজবন্দি, যিনি মহিলা, শিক্ষিতা, জমিদারবাড়ির পুত্রবধূ এবং যিনি একেবারেই অসহায়, একাকী। ইলা মিত্রের দ্বিধা ছিল এই জবানবন্দি দিতে। কেন ছিল, যে কেউ বুঝবেন জবানবন্দিটি পড়লে। সহরাজবন্দি মহিলারা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন যা ঘটেছে আদালতকে বলতে, যেন জানতে পারে দেশবাসী। তবু সংকোচ ছিল ইলা মিত্রের। কোন নারী তাঁর নিগ্রহের কথা, লজ্জার কথা বলতে চান মুখ ফুটে? যুগ-যুগান্তের দ্বিধা কাটল তখন, যখন বলা হলো যথার্থ বিবরণ না দিলে পার্টির সদস্য পদ কাটা যাবে। তিনি রাজি হয়েছেন। পার্টির বাইরে কোনো জীবন ছিল না তাঁর বোঝা যায়। জবানবন্দিতে অবশ্য কোনো কাজ হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন তিনি, তাদের কারোরই কোনো শাস্তি হয়নি, শাস্তি ইলা মিত্রেরই হয়েছিল, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ফাঁসিই হয়ে যেত, যাবজ্জীবন পেলেন নেহাত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অপরাধের। কিন্তু ফল হয়নি বলি কী করে? ওই জবানবন্দি কি ছড়িয়ে যায়নি মুখে মুখে, কানে কানে? তিন বছর পর সাধারণ নির্বাচনে নির্যাতনকারী মুসলিম লীগের মুখের ওপর কি জবাব দিয়ে দেয়নি দেশবাসী, থুতু ছিটিয়ে?
ওই নিপীড়ন অবশ্য এক দিকের ছবি। আরো একটি দিক ছিল বটে। সমান গুরুত্বের। হয়তো বা বেশিই। সেটি মানুষের মহত্ত্বের। ইলা মিত্রের সঙ্গীরা সাধারণ কৃষক। তাঁদের একজনও তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেননি। ‘রানীমা’ তাঁদের শিখিয়ে দিয়েছিলেন পুলিশ মারতে—এই কথাটি আদায় করার জন্য বন্দিদের ওপর এমন কোনো অত্যাচার নেই, যা করা হয়নি। মারতে মারতে একজনকে মেরেই ফেলা হলো, চোখের সামনে। অন্যরা যাতে ভয় পান। মুখ খোলেন। কিন্তু কেউ মুখ খোলেননি। একজনও রাজসাক্ষী জোগাড় করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি ওই নির্যাতনকারী পুলিশ বাহিনীর মধ্যেও মানুষ ছিল। যেমন—নবাবগঞ্জ থানার ওসি। ইলা মিত্র লিখেছেন, ‘ওসি রহমান সাহেব রাতে সবার অলক্ষ্যে সেলে এসে আমার মাথা ধুইয়ে দিতেন, ফল খাইয়ে যেতেন। সে মহানুভবতার কথা আমি ভুলব না।’ ঢাকায় বন্দি অবস্থায় তাঁর চিকিৎসক ছিলেন ডা. কে এস আলম। এই চিকিৎসক কেবল চিকিৎসা করেননি। প্যারোলে যাতে তিনি মুক্তি পেতে পারেন তার সুপারিশ করেছেন এবং নিজে তাঁর সঙ্গে কলকাতা পর্যন্ত গিয়ে হাসপাতালে রেখে তবে ঢাকায় ফিরেছেন। ফলে ওই চিকিৎসকের চাকরিতে অবনতি ঘটানো হয়েছিল।
হতে পারে এই বক্তব্যে পিঠ চাপড়ানোর একটি উপাদান ছিল। কিন্তু সেসব কিছুই ছিল না ছাত্রদের মধ্যে। রাজশাহী কোর্টে যারা কালো ব্যাজ পরে ঘুরেছে, ঢাকার মেডিক্যাল হাসপাতালে ইলা মিত্রকে যারা দেখতে গেছে দলে দলে, কেবল তা-ই নয়, ইলা মিত্রের ফেরারি, আত্মগোপনকারী স্বামী, নাচোল মামলার যিনি ১ নম্বর অভিযুক্ত আসামি, স্ত্রীর সঙ্গে যাঁর দেখা নেই চার বছর, তাঁকেও নিয়ে এসেছিল তারা হাসপাতালে। বন্দি ইলা মিত্র স্বামীকে দেখে চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু তিনি ধরা পড়েননি; পুলিশি পাহারাদারদের চেয়ে আরো বড় হুঁশিয়ার ছাত্ররা তাঁকে নির্বিঘ্নে এনেছে এবং নিরাপদেই বের করে দিয়েছে। শত শত মানুষ এসেছে ইলা মিত্রকে একনজর দেখতে, হাসপাতালে। বাইরে তারা আন্দোলন করেছে তাঁর মুক্তির জন্য।
ইলা মিত্র ছিলেন কলকাতার মেয়ে। কলেজে পড়তেন। খেলাধুলা করতেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে যোগ ছিল। কলকাতায় থাকতেই। তার পরে নাচোলে গেলেন জমিদারবাড়ির পুত্রবধূ হয়ে। সাত মহলার সেই বাড়িতে বন্দিনি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর, প্রথা ছিল সেটিই। স্বামী রমেণ মিত্র ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির লোক, তাঁর সাহায্যে বেরিয়ে এসেছেন গণ্ডি ভেঙে। সাঁওতালদের সঙ্গে মিশে গেছেন তাঁদের একজন হয়ে। যখন ধরা পড়েন, তখনো সাঁওতাল রমণীর ছদ্মবেশেই ছিলেন তিনি। সেই যে রাজনীতিতে এলেন আর ফিরলেন না। কোথায় রইল পরিবার, কোথায় বাড়িঘর, একমাত্র শিশুসন্তান। পরেও ফেরেননি। কলকাতায় গিয়ে এমএ পাস করেছেন প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে। অধ্যাপিকা হয়েছেন। সেখানেও জেল খেটেছেন। চারবার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায়। রাজনীতিতেই থেকেছেন, সব সময়ে।
পূর্ববঙ্গে এসে ইলা মিত্রের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল প্রথমেই। সেটি শিক্ষাসংক্রান্ত এবং শিক্ষামূলক। ইলা মিত্র তাঁর এলাকায় মেয়েদের স্কুল খুলেছিলেন গরিব মানুষের জন্য। সেখানে আগে কোনো স্কুল ছিল না। জমিদাররা চাননি। জোতদাররা চাননি। সাত মহলার জমিদারবাড়িতে বন্দিনি হয়ে থাকতে প্রস্তুত ছিলেন না ইলা মিত্র। তাই তিনি বেরিয়ে এলেন, স্কুল খুললেন, সেই সাতচল্লিশেই। এবং সঙ্গে সঙ্গে জমিজমার মালিক যারা, ওপরতলার মানুষ, তারা লাগল তাঁর পেছনে। ‘কুকুরের মতো মাটি শুঁকতে লাগল তারা।’ বলল, স্কুল শরিয়তবিরোধী, ওখানে নিয়ে বেপর্দা করা হচ্ছে মেয়েদের, তাদের ম্লেচ্ছ করে তোলা হচ্ছে। এসব চলবে না। তখন গ্রামের সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ জড়ো হলো পৃথক সারিতে, আরো বড় সমাবেশে। ইলা মিত্র লিখেছেন, ‘জমিহীন, কপর্দকহীন এবং নিজে সম্পূর্ণ অক্ষরজ্ঞানশূন্য ক্ষেতমজুর ওয়াজেদ মোড়ল বালিকা বিদ্যালয়ের বিতর্কের জনসভায় দাঁড়িয়ে বললেন, ওই যে আমিনা বিবি মিয়াপাড়ায় সাহেবদের খামারে বাঁদিগিরি করে, সে বুঝি মুসলমান নয়। নদীর পানি টেনে সাহেবদের স্ত্রীদের জন্য যারা গোসলের পানি জোগায়, সেই মুসলমান মেয়েরা আল্লাহর কাছে বুঝি সম্পূর্ণ অস্পৃশ্য।’
ঘটনা কিন্তু ওখানেই থেমে থাকেনি। এগিয়েছে তার পরেও। দেখা গেল ওই যে ঝগড়া মেয়েদের স্কুল নিয়ে, তা নতুন নতুন দিগন্তে প্রসারিত হচ্ছে। ‘গরিবের দল হেঁকে বলল, সুদ খাওয়া হারাম। দিকে দিকে ওই প্রচার ক্রমে ক্রমে দাবানলের সৃষ্টি করল।’
ভয়টা ওখানেই। শুরু হলে থামে না, নতুন নতুন বাঁক নেয়, নব নব দিগন্তে প্রসারিত হয়ে পড়ে। একটি থেকে জন্ম হয় আরেকটির। সৃষ্টি হয় দাবানলের। এ জন্যই বাধা দেওয়া, মাটিতে গন্ধ শোঁকা। অনেকেই পিছিয়ে গেছে। ‘কেন বোন পারুল ডাক রে’ নামে সুন্দর একটি কবিতা লিখেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ইলা মিত্রকে নিয়ে। ‘শিয়রে জেগে সাতটি ভাই/মৃত্যুকে আজ তাড়ায়’।
ইলা মিত্র নিজের সুখ-সুবিধার কথা ভাবেননি। তেভাগা আন্দোলনের ওই কৃষকদেরই একজন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, যাঁদের একজন নিহত হয়েছিলেন পুলিশি নির্যাতনে, আরো কমপক্ষে ৫০ জন প্রাণ দিয়েছেন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর। তাঁদের সবার স্বার্থ এক ও অভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ইলা মিত্রের স্বার্থও। সবার সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই জোরটা ছিল তাঁর, নইলে সবটাই তো অন্ধকার।
আমাদের ইতিহাসে আত্মসমর্পণ আছে, আর আছে প্রতিরোধ। আত্মসমর্পণের ইতিহাসটাকেই গৌরবের বলে প্রচার করা হয়। প্রতিরোধের ইতিহাসটা হারিয়ে যায় অন্ধকারে। ইলা মিত্র একা নন, আরো অনেকে ছিলেন, এখনো আছেন। তাঁদের ইতিহাসটাই আসলে আলোর, যদিও কাজ করেছেন তাঁরা অন্ধকারে। অন্ধকারের বিরুদ্ধেই লড়াই তাঁদের। ভাই চম্পার, বোন পারুলের। জীবন ও মৃত্যুর, আলো ও অন্ধকারের এই দ্বন্দ্ব চলেছে, চলবে। এখানে আপসের কোনো জায়গা নেই। আসলেই।