সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সমাজ পরিবর্তনের জন্য সংস্কার প্রয়োজন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৬ বার পড়া হয়েছে

শেখ রফিক

আপনার সামাজিক অবস্থান বা পরিচয় যতই উঁচু হোক না কেন, যদি মনুষ্যত্ববোধ ও ন্যায়বোধ না থাকে, তবে আপনি সমাজের জন্য বিপজ্জনক। বাংলাদেশে বর্তমানে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারি, দুর্নীতি ও সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে একটি ‘মব সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছে, যা বিরোধী মত ও গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর দমনে সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্রমিক, শিক্ষক ও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন দমনেও সহিংসতা ব্যবহার করা হয়েছে।

অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সম্পদের অসম বণ্টন। যখন মানুষ প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি, লিঙ্গবৈষম্য এবং ঘৃণার রাজনীতি সমাজে বিকৃত মানসিকতার অপরাধী তৈরি করে। অপরাধকে ‘ট্রেন্ড’ হিসেবে দেখা এবং অসৎ জীবনযাপনের প্রতি সামাজিক সহানুভূতি একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি করছে।আমাদের সমাজে ধর্ষক, খুনি, দুর্নীতিবাজ, মাদকাসক্ত ও বিকৃত মানসিকতার মানুষের উপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের অসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক দমননীতি এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের ফলাফল। সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে একদিকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে ক্ষমতাবানরা অবৈধ উপায়ে সম্পদ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন। এর ফলে সমাজে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও অপরাধপ্রবণতা ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে।বর্তমানে দেশে অপরাধ দমনে তাৎক্ষণিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে। সরকারের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল, স্থানীয় সম্প্রদায় ও গণমাধ্যমকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের সংখ্যা হ্রাস পাবে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কমবে, মানুষ অপরাধ নয়, বরং সৃজনশীলতায় যুক্ত হবে। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পেলে দুর্নীতি, কালোবাজারি ও মুনাফালোভী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমে আসবে।

রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিও অপরাধ ও বৈষম্য রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় এবং প্রশাসনের জবাবদিহি থাকে, তখন অপরাধীরা আর রাজনৈতিক আশ্রয় পায় না। পক্ষান্তরে রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের প্রভাব ও দমনমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণই অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছ নির্বাচনই একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ মানে, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতার কাঠামোতে সবাইকে জায়গা দেওয়া, যাতে বৈচিত্র্য, ভারসাম্য এবং মানবিক ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, যে দেশগুলোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ আছে, সেখানে উন্নয়ন টেকসই হয়, সংঘাত কমে এবং জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রের অংশীদার বলে মনে করে।

সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি অপরাধ প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সমাজে যদি মানবিকতা, নৈতিকতা, নারীর মর্যাদা ও সমানাধিকার চর্চা হয়, তাহলে অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণই সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং শান্তি টেকসই হয়েছে। এটি ছাড়া গণতন্ত্রের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ৩১ দফা রূপরেখা এবং ভিশন ২০৩০-এ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ও নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক রূপান্তরের বার্তা বহন করে।

আমাদের সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু আইনের অবক্ষয় নয়, এটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলনও বটে। এই সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রীয় সংস্কারই একমাত্র সমাধান। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে শাসকদের প্রতি জনগণের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন ও স্বচ্ছ হবে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করা হবে। সার্বিকভাবে রাষ্ট্রীয় অপরাধ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনি বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিষয়।

বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে উন্নত, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে এই চ্যালেঞ্জগুলোর সম্মুখীন হয়ে স্থায়ী সমাধান করতে হবে। গোটা সমাজ পরিবর্তনের জন্য সংস্কার অপরিহার্য, তবে তা শুধু কাঠামোগত পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকলে ব্যর্থ হবে। প্রকৃত রূপান্তর তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় স্তরে নৈতিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক চেতনায় পরিবর্তন আসে। দুর্নীতি রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, যদি মানুষ তা সহনীয় মনে করে; শিক্ষাকাঠামো বদলালেই জ্ঞান ও নৈতিকতা বাড়বে না, যদি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটে; গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না, যদি নাগরিকরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ না করে।

এই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন একটি নির্বাচিত সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক শাসন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে স্বৈরাচার ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের প্রতিবাদের প্রতিফলন। জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা, তারা যেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নিজ নিজ প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। জনগণ বিশ্বাস করে, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের তারিখ নির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রকাশ করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কিছুটা কমে আসবে এবং গণতান্ত্রিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে।

 

লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com