সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষিই এই দেশের প্রধান কর্মসংস্থান এবং খাদ্য উৎপাদনের মূল উৎস। অথচ প্রতিনিয়ত দেশের কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূমির ব্যবহার কৃষি জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস করছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

কৃষিজমি কমার কারণ : বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একদিকে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কৃষিজমির পরিমাণ সংকুচিত করছে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিজমির টিকে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নানা কারণে দেশের চাষযোগ্য জমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নিচে কৃষিজমি কমার প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো-

দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ : দেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, সেইসঙ্গে বাড়ছে বসবাসের জায়গার প্রয়োজনীয়তা। ফলে কৃষিজমি দখল করে আবাসিক এলাকা, রাস্তাঘাট, শিল্প-কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। অনেক সময় পরিকল্পনাহীনভাবে এগুলো তৈরি হওয়ায় বিপুল পরিমাণ উর্বর কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে।

শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা বৃদ্ধি : শিল্প খাত সম্প্রসারণের জন্য বড় বড় কলকারখানা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক এবং ইকোনমিক জোন তৈরি করা হচ্ছে কৃষিজমির ওপর। এটি একদিকে শিল্পের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, তবে অপরদিকে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

নদী ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ : বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, যেখানে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো অঞ্চল নদীভাঙনের শিকার হয়। তিস্তা, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও অন্যান্য বড় নদীগুলো গ্রাস করছে হাজার হাজার একর উর্বর কৃষিজমি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ভূমিক্ষয়ের মাত্রাও বাড়ছে, যা কৃষিজমির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে।

অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও জমির খণ্ডীকরণ : অনেক এলাকায় কৃষিজমিকে আবাসিক ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে, যার ফলে চাষযোগ্য জমির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া উত্তরাধিকারসূত্রে জমি খণ্ডিত হতে হতে এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যে, চাষবাস পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ছোট ছোট টুকরো জমিতে লাভজনক চাষাবাদ সম্ভব না হওয়ায় কৃষকরা জমি বিক্রি করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে ফসল চাষ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব : কৃষিজমি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদনের ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও কৃষিজমির পরিমাণ কমতে থাকলে এই অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা : কৃষিজমি কমে গেলে উৎপাদনও কমবে, ফলে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ধান, গম, ডাল, শাক-সবজি, ও ফলমূল উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

খাদ্যের দাম বৃদ্ধি : যদি খাদ্য উৎপাদন কমে যায়, তবে বাজারে সরবরাহ কমে যাবে, যার ফলে খাদ্যের দাম বাড়বে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তাদের খাদ্য কেনার সামর্থ্য হ্রাস পাবে।

খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি : দেশীয় উৎপাদন কমলে খাদ্যের ঘাটতি মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে, কারণ বৈশ্বিক সংকট বা অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে খাদ্য আমদানি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

পুষ্টিহীনতা ও দারিদ্র্যের প্রসার : খাদ্যের সহজলভ্যতা কমে গেলে পুষ্টিহীনতা বাড়বে। বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে অক্ষম হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্য খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কৃষিজমি কমে যাওয়ার প্রভাব : শুধু খাদ্য নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।

কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকা সংকট : বাংলাদেশের একটি বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিজমি কমে গেলে তাদের আয়ের উৎস সংকুচিত হবে, যা দারিদ্র্যের হার বাড়িয়ে দেবে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে শহরমুখী হবে, যা নগরায়ণের চাপ আরো বাড়িয়ে দেবে।

পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট : কৃষিজমি বনভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষিজমি কমে গেলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে, বিশেষ করে দেশীয় ফসল ও প্রাণিসম্পদের অস্তিত্ব সংকট দেখা দেবে।

পানির সংকট ও ভূমিক্ষয় : কৃষিজমি কমে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে খরার সময় সুপেয় পানি ও সেচের জন্য পানির সংকট দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ভূমিক্ষয় বাড়বে, যা বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়াবে।

সমাধান ও করণীয় : কৃষিজমি সংরক্ষণ করা না গেলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

কঠোর কৃষিজমি সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন : কৃষিজমির যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে কৃষিজমিতে শিল্প-কারখানা, আবাসন প্রকল্প বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

টেকসই নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা : নগর ও গ্রামীণ অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে, যাতে কৃষিজমি ধ্বংস না হয়। নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পতিত বা অনাবাদি জমির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আধুনিক কৃষিপদ্ধতির প্রয়োগ : সংকুচিত কৃষিজমি থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন পেতে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। মাল্টি-ক্রপিং, ভার্টিক্যাল ফার্মিং, হাইড্রোপনিক্স ও জৈব চাষের প্রচলন বাড়াতে হবে।

চাষের অনুপযুক্ত জমি পুনরুদ্ধার : নদীভাঙনে বিলীন হওয়া জমি পুনরুদ্ধার করে পুনরায় কৃষিকাজের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া লবণাক্ততা প্রতিরোধে উপকূলীয় অঞ্চলে উপযোগী ফসল চাষের দিকে নজর দিতে হবে।

কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা বৃদ্ধি : কৃষকরা যেন সহজে কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। ছোট কৃষকদের জন্য সহজশর্তে ঋণ ও কৃষি সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।

সচেতনতা ও উদ্যোগই ভবিষ্যৎ রক্ষা করবে : কৃষিজমি কমে যাওয়ার ফলে শুধু কৃষি খাত নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। খাদ্য সংকট, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, পুষ্টিহীনতা এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেলে জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই এখনই সচেতন হওয়া এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সরকার, নীতিনির্ধারক, কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ জনগণ- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কৃষিজমি সংরক্ষণ করা সম্ভব। পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্প স্থাপনার জন্য অনাবাদি বা পতিত জমির ব্যবহার, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা কৃষিজমির ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারি। কৃষকদের জন্য নীতি সহায়তা, সহজশর্তে ঋণ এবং প্রণোদনা নিশ্চিত করা হলে তারা কৃষিকাজে আরো উৎসাহী হবেন এবং জমি বিক্রি না করে উৎপাদনশীলতার দিকে মনোনিবেশ করবেন। এখনই যদি কৃষিজমি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরো প্রকট হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ধরে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সচেতনতা ও দায়িত্বশীল উদ্যোগই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং একটি টেকসই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com