ইসরাইল ও হামাস গাজায় শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইসরাইল ও হামাস উভয়ই আমাদের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে স্বাক্ষর করেছে। এর অর্থ হলো খুব শিগগিরই সব জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং ইসরাইল নিজেদের সেনাদের নির্ধারিত একটি লাইনে সরিয়ে আনবে।’
শান্তি চুক্তি সই হওয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে গাজাবাসীকে, ইসরাইলেও অনেকে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। ইসরাইলি সরকার এই চুক্তি অনুমোদন দিলে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এরপর বাকি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং গাজার বেশ কিছু জায়গা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উদ্যোগে শান্তির জন্য আলোচনা আরো জোরদার হয়েছে। কেবল হামাসকেই নয় তিনি ইসরাইলকেও শান্তি চুক্তির জন্য চাপ দিয়েছেন। দুই বছর পরে গাজা যুদ্ধ অবসানের এমন আশা থাকলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা এখনও বাকি রয়েছে। যেমন- গাজা কে পরিচালনা করবে এবং হামাসের ভবিষ্যৎ কী হবে সে পরিকল্পনা এখনো করা হয়নি।এদিকে, গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে বড় ধরনের বন্দিবিনিময় প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। হামাসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরাইল প্রায় ১ হাজার ৯৫০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। এর মধ্যে ২৫০ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং বাকি ১ হাজার ৭০০ জন যুদ্ধ শুরুর পর আটক হয়েছে। এর বিনিময়ে হামাস ২০ জন জীবিত ইসরাইলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে। হামাস জানিয়েছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই বিনিময় প্রক্রিয়া শুরু হবে। সউদী টেলিভিশন আল-শার্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্দি ও জিম্মি বিনিময় আগামী সপ্তাহে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য চ্যানেল আল-হাদাথ জানায়, ৭২ ঘণ্টার সময় গণনা শুরু হবে তখনই, যখন ইসরাইলি সেনারা গাজার নির্ধারিত সীমারেখায় সরে যাবে।
এক ফিলিস্তিনি সূত্র আলজাজিরাকে জানায়, মধ্যস্থতাকারীরা ফিলিস্তিনিদের প্রস্তাবিত মানচিত্রে সম্মতি দিয়েছে, যাতে ইসরাইলি সেনাদের ধীরে ধীরে গাজার শহরগুলো থেকে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। হামাসের মতে, চুক্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে রাফাহ সীমান্ত দুদিকেই খুলে দেওয়া হবে, আহতদের মিশরে স্থানান্তরের অনুমতি মিলবে এবং প্রথম পাঁচ দিনে প্রতিদিন অন্তত ৪০০ ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করবে। এ ছাড়া দক্ষিণ গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষদের গাজা সিটি ও উত্তরাঞ্চলে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে। চুক্তি গাজার মানুষের জীবনে স্বস্তি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।গাজা পুনর্গঠনে অন্যান্য দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রও অংশগ্রহণ করবে : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, অন্যান্য দেশের সাথে গাজা পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রও অংশগ্রহণ করবে। ‘আমি মনে করি, আপনারা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে দেখবেন এবং আপনারা গাজা পুনর্গঠিত হতে দেখবেন,’ ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘শান্তি পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা ‘পুরো গাজা পরিস্থিতির সাথে অনেক কিছু জড়িত থাকবে’।
গাজাবাসীর আনন্দ উৎসব উদযাপন : বেশ কিছু ভিডিওতে গাজাবাসীকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি খবরে উদযাপন করতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি মুক্তির চুক্তির সংবাদ উদযাপনের বিভিন্ন ভিডিও প্রচারিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সাঈদ মোহাম্মদ ইনস্টাগ্রামে রাতের একটি ভিডিও ফুটেজ পোস্ট করেছেন। এতে দেখা গেছে, প্রধান শহর দেইর আল বালাহতে আল-আকসা হাসপাতালের বাইরে পুরুষ ও মহিলাদের ব্যাপক সমাগম দেখা গেছে। সঙ্গীতের তালে তালে নেচে নেচে শিস এবং হাততালি দিতে দেখা যাচ্ছে তাদের। একইসাথে ‘আল্লাহু আকবর’ রব তুলতেও দেখা গেছে। আরেকজন সাংবাদিক মোহাম্মদ আল-হাদ্দাদ-এর আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গাজার অন্য আরেকটি স্থানের রাস্তায় তরুণদের একটি ছোট দলকে নাচতে দেখা যাচ্ছে।বিশ্ব নেতাদের শুভেচ্ছা : জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতেরেস সব পক্ষকে এই চুক্তির সব শর্ত মেনে চলতে আহ্বান জানিয়েছেন। গুতেরেস বলেন, ‘এই দুর্ভোগের অবসান হওয়া উচিত।’ সউদী আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে, তারা আশা করছে যে এর ফলে ‘সম্পূর্ণ ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার’ এবং ‘মানবিক দুর্ভোগ লাঘবের জন্য জরুরি পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে। ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করুন, এবং দুই-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত ও ব্যাপক শান্তি অর্জনের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করুন,’ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ‘দুই বছরের দুর্ভোগ ও দুর্দশার’ পর গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি ‘কেবল যুদ্ধের অধ্যায় বন্ধ করে না। এটি ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতার দ্বারা নির্ধারিত ভবিষ্যতের জন্য এই অঞ্চলের জনগণের জন্য আশার দ্বারও খুলে দেয়’। তাছাড়া, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শার্ম আল-শেখ শহরে উন্নয়নের প্রশংসা করেছে, যেখানে আলোচনা হয়েছে, এটি ‘গাজার যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’। চীনও ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে চুক্তির ঘোষণাকে স্বাগত বলেছে যে, তারা গাজা উপত্যকায় একটি ‘স্থায়ী এবং ব্যাপক’ যুদ্ধবিরতি আশা করছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন একটি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে চীন ‘ফিলিস্তিন শুধু ফিলিস্তিনিদের দ্বারাই শাসন করা উচিত’ এই নীতি মেনে চলার পক্ষে।
ট্রাম্পের অনুরোধে ভূমিকা রেখেছে তুরস্ক : ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করার জন্য হামাসকে রাজি করাতে তুরস্ককে অনুরোধ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আঙ্কারা ইতোমধ্যে হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করছে। তুরস্ক প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং আলোচনায়ও যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি ইসরাইলের অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে এটিকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। আঙ্কারা ইসরাইলের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধ করেছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছে এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের দাবি তুলেছে। আজারবাইজান সফর শেষে দেশে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এরদোগান বলেন, তুর্কি কর্মকর্তারা বুধবার মিসরের শার্ম আল-শেখে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। আমরা শুরু থেকেই হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। এখনও রাখছি। তিনি আরও বলেন, আমরা তাদের বোঝাচ্ছি কীভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত পথে অগ্রসর হওয়া যায়, কী করলে ফিলিস্তিন দৃঢ়ভাবে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারে। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, তাস, আল-জাজিরা।