বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি, রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে হ্যারাসমেন্টের শিকার হন। মিথ্যা মামলার শিকার হন। আমাদের বহু নেতাকর্মী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জেল-জুলুম খেটেছে। তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আপনি কি বলতে পারবেন, এর কোনটার মধ্যে দিয়ে আমি যাইনি? এর প্রতিটার ভেতর দিয়ে আমি গিয়েছি। প্রতিটি স্তর পার করে এসেছি আমি। আমি শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছি, যে নির্যাতনের চিহ্ন এখনো কখনো কখনো আমাকে সহ্য করতে হয়। জেল-জুলুম খেটেছি আমি। বিভিন্নভাবে মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হয়েছি আমি। সবকিছুর ভেতর দিয়েই আমি পেরিয়ে এসেছি।’
তিনি বলেন, ‘রাজনীতি পরিবারকরণ হয় না। এটি সমর্থনের ভিত্তিতে হয়। কাজেই যে অর্গানাইজ করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে দলকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে, সে এগিয়ে যেতে পারবে। সময় ও পরিস্থিতি সবকিছু প্রমাণ করে দেবে।’
নির্বাচনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা কী হবে : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কি এই নির্বাচনে কোনো ভূমিকায় থাকবেন—এই প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনি এমন একজন মানুষের কথা বলেছেন, যে মানুষটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, যতবার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে, প্রতিবার উনি অবদান রেখেছেন সেই গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত বা পুনরুদ্ধার করার জন্য। এবারও আপনাদের সবার চোখের সামনেই ঘটেছে যে কিভাবে স্বৈরাচারের সময় তাঁর ওপর অত্যাচারের খড়্গহস্ত নেমে আসে। কিন্তু উনি আপস করেননি।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ রকম একজন ব্যক্তি আজ অসুস্থ। কেন কিভাবে উনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেন, মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাঁকে জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁকে চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। সব কটি ঘটনাই দেশবাসী জানে। তার পরও মানুষটির এত বড় অবদান রয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার। আমি সেই দলের একজন কর্মী হিসেবে বিশ্বাস করি বা বিশ্বাস করতে চাই, গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যেই প্রত্যাশিত, জনপ্রত্যাশিত যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, উনার শারীরিক সক্ষমতা যদি অ্যালাও করে উনাকে, নিশ্চয়ই উনি কিছু না কিছু ভূমিকা রাখবেন।’
খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি আমি এখনো বলতে পারছি না। আমি মাত্রই বললাম যে উনার শারীরিক বা ফিজিক্যাল অ্যাবিলিটির ওপরে বিষয়টি কিছুটা হলেও নির্ভর করছে।’
নির্বাচন এককভাবে নাকি জোটগতভাবে : একক বা জোটগত নির্বাচনের ব্যাপারে তারেক রহমান বলেন, ‘দেখুন, আমরা প্রায় ৬৪টি রাজনৈতিক দল বিগত স্বৈরাচারের সময় যার যার অবস্থান থেকে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমরা চেষ্টা করেছিলাম কমবেশি একসঙ্গে কাজ করার। আমাদের সঙ্গে যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সবার মতামত নিয়ে আমরা ৩১ দফা দিয়েছি। যে দলগুলোকে আমরা পেয়েছি আমাদের সঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে, আমরা চাই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে।’
জামায়াতে ইসলামীর জোটকে উদ্বেগ হিসেবে দেখেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যে সংবিধান এখনো যেটি আছে, এই সবকিছুর ভেতরে থেকে, অর্থাৎ মানুষের সমর্থন-গ্রহণযোগ্যতা সবকিছুর ভেতরে থেকে যারা রাজনীতি করবে, তারা করতেই পারে। এটাতে তো কোনো সমস্যা বা উদ্বেগের কারণ আমি দেখি না। আর ইলেকশন হলে তো ইলেকশনে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতেই পারে। এতে উদ্বেগের কী আছে?’
কেমন ব্যক্তি নমিনেশন পাবেন : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের নমিনেশনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত সব সময় কমবেশি যা ছিল বা ভবিষ্যতে আমরা যেটিকে মূল্যায়ন করব—সেটি হচ্ছে অবশ্যই কোনো একটি পার্টিকুলার এলাকা থেকে আমরা আমাদের দলের এমন একজন ব্যক্তিকেই নমিনেশন দিতে চাইব, যে ওই এলাকার সমস্যা সম্পর্কে সচেতন আছে, যার সঙ্গে ওই এলাকার মানুষের সম্পৃক্ততা আছে, ওঠাবসা আছে, যে ওই এলাকার মানুষের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম।’
ভোটারদের আশ্বস্ত করবেন কিভাবে : তারেক রহমান বলেন, ‘আমি ভোটারদের এতটুকু বলতে পারব, আমরা যদি সুযোগ পাই, জনগণ যদি আমাদের সেই সুযোগ দেয়, তাহলে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আমরা যাতে এমন একটি অবস্থা তৈরি করতে পারি, যেখানে কিছুটা হলেও আমরা বহির্বিশ্বে বিশ্বের অন্য দেশের সামনে কিছুটা হলেও যাতে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখেছেন যে প্রায় সাত হাজারের মতো আমাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আমরা কিছু সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এরা সবাই কিন্তু অভিযোগের সঙ্গে জড়িত নয়। আবার আরেকটি উদাহরণ আমি দিই যা সত্য, যা বাস্তব। স্বৈরাচারের সময় সারা বাংলাদেশে আমাদের ৫০ লাখের বেশি নেতাকর্মীর নামে বিভিন্ন রকম গায়েবি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। আমাদের বহু নেতাকর্মী তাদের ঘরবাড়িতে থাকতে পারত না। তাদের বিভিন্নভাবে পালিয়ে থাকতে হতো। বিভিন্নভাবে সরে থাকতে হতো। এই সুযোগে স্বৈরাচার তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দোকানপাট ঘরবাড়ি জমিজমা পুকুর দখল করে নিয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই আমাদের নেতাকর্মীরা তাদের নিজেদের যেগুলো বৈধ সম্পত্তি, পৈতৃক সম্পত্তি সেগুলো আবার ফিরে পেতে গেছে। তখন আবার কিছুসংখ্যক লোক প্রচার করেছ যে বিএনপির লোকজন দখল করতে গেছে। এ রকম ঘটনা প্রচুর ঘটেছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তবে এখানে আমার একটি প্রশ্ন আছে, যে প্রশ্নটি আমরা পাবলিকলিও করেছি। দেখুন, আমরা একটি রাজনৈতিক দল। কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমরা অস্বীকার করছি না। ঘটেছে যেমন, আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি তাদের বিরুদ্ধে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি ইনশাআল্লাহ সরকার গঠন করলে আমার দলের কোনো নেতাকর্মী তখনো যদি এ রকম কোনো অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত হয়, আমরা দলের অবস্থান থেকে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেব।’
কোনো ব্যক্তি নয়, মাস্টারমাইন্ড গণতন্ত্রকামী জনগণ : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘অবশ্যই এই জুলাই আন্দোলনে আমাকে আমি কখনোই মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দেখি না। এই আন্দোলনটির প্রেক্ষাপট শুরু হয়েছে কিন্তু বহু বছর আগে থেকে। এই আন্দোলনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা, সেটি বিএনপি হোক বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলো হোক, যারা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছে। বিভিন্নভাবে নেতাকর্মীরা নির্যাতিত হয়েছে। আমি মনে করি, জুলাই-আগস্ট মাসে এসে জনগণ সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি সেদিন মাদরাসার ছাত্ররা, তারা ছিল এই আন্দোলনের মাঠে। আমরা দেখেছি গৃহিণীরা পর্যন্ত রাস্তায় নেমে এসেছেন সন্তানের পেছনে। আমরা দেখেছি কৃষক, শ্রমিক, সিএনজি চালক, ছোট দোকান কর্মচারী বা দোকান মালিক থেকে শুরু করে গার্মেন্টস কর্মী—তাঁরা নেমে এসেছিলেন। আমরা দেখেছিলাম সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নেমে এসেছিলেন। এমন অনেক সাংবাদিক, যাঁরা স্বৈরাচারের অত্যাচারে নির্যাতিত হয়ে দেশ থেকে বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁরা সম্পৃক্ত হয়েছিলেন এই আন্দোলনে। এই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের জনগণের আন্দোলন, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড।’
তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে যতটুকু আমার মনে আছে প্রায় ৬৩ জন শিশু শহীদ হয়েছে, মারা গেছে। আন্দোলনে স্বাভাবিকভাবেই দুটি পক্ষ আছে। একটি পক্ষ হচ্ছে মানুষ শহীদ হয়েছে। দুই হাজারের মতো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে আন্দোলনে। আবার আরেকটি পক্ষ হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজারের মতো মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, অন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের উচিত হবে, তাদের এই আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানো।’
ডাকসুর প্রভাব পড়বে না জাতীয় রাজনীতিতে : তারেক রহমান বলেন, ‘একটা অগ্রযাত্রা শুরু হলো, কিন্তু আমরা চাইছিলাম না যে কোনো বিতর্কের মধ্যে এগুলো পড়ুক। আমরা আশা করব যে পরবর্তী সময়ে যেগুলো হবে সেগুলো বিতর্কবিহীন হবে নির্বাচনগুলো। মান্না ভাই, উনাকে, উনি তো বোধ হয় দুইবার ভিপি ছিলেন। আমার চেয়ে অনেক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ। আমরা যদি উনার বক্তব্য শুনে থাকি বা ধরে থাকি, তাহলে তো আমি মনে করি না যে ডাকসুর প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়ার কোনো কারণ আছে।’
আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রসঙ্গে : তারেক রহমান বলেন, ‘আমি ১৭ বছর যাবৎ প্রবাসজীবনে আছি। আমি যখন এখানে আসি, আমার ভাইকে আমি রেখে এসেছিলাম, ছোট ভাইকে। আমি যখন এই দেশে আসি, আমার সুস্থ মাকে আমি রেখে এসেছিলাম। একটি ঘর রেখে এসেছিলাম—যেই ঘরে আমি এবং আমার ছোট ভাই বড় হয়েছি, যেই ঘরে আমার বাবার স্মৃতি ছিল, যেই ঘরে আমাদের দুই ভাইয়ের সন্তানরা জন্মগ্রহণ করেছিল, যেই ঘরে আমার মায়ের বহু স্মৃতি ছিল, সেই স্মৃতিগুলোকে ভেঙেচুরে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যে ভাইকে আমি রেখে এসেছিলাম, সেই ভাই এখন আর নেই। যেই সুস্থ মাকে রেখে এসেছিলাম সেই সুস্থ মা এখন সুস্থ নেই। শুধু অসুস্থই নন, উনার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনও করা হয়েছে। আমি আমার পরিবারের যেই কাহিনি আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। এ রকম কাহিনি বাংলাদেশের শত না, হাজার হাজার পরিবারের। এখন দল হিসেবে তারা (আওয়ামী লীগ) যদি অন্যায় করে থাকে, তাহলে দেশের আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। দেশের আইন সিদ্ধান্ত নেবে। যারা জুলুম করেছে, তাদের তো বিচার হতে হবে। সেটি ব্যক্তিও হতে পারে, দলও হতে পারে।’