যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগমুহূর্তে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। আজকের এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে ভোটারদের মধ্যে। তাদের অনেকেই এ পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করছেন, বিশেষ করে শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তবে অর্থনীতির পরিসংখ্যান ভিন্ন একটি চিত্রও তুলে ধরছে। ইতিবাচক দিক হলো, বেকারত্বের হার এখনো ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মানুষ কর্মসংস্থানের আওতায় রয়েছেন। সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক প্রবাহ শেয়ারবাজারের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষের অবসরকালীন সঞ্চয়ের পরিমাণও বেড়েছে।
তবে এসব ইতিবাচক প্রবণতার বিপরীতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি। কয়েক বছর আগের তুলনায় এর হার অনেকটা কমলেও এখনো তা যথেষ্ট বেশি। ফলে গাড়িতে জ্বালানি ভরা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ কিংবা রেস্তোরাঁয় খাবারের অর্ডার দেওয়ার সময় বাড়তি খরচের চাপ অনুভব করছেন সাধারণ মানুষ।
আজ মঙ্গলবারের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। ভোট দিতে যাওয়ার সময় তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নীতির বিষয়টি ভোটারদের বিবেচনায় থাকছে। তাদের মনোভাবও ইতিবাচক নয়; বরং অনেকের মধ্যে বিরক্তি ও হতাশা কাজ করছে।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে সাধারণভাবে অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মনোভাবের অবনতি হয়েছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গতকাল সোমবার শেষ মুহূর্তের প্রচারে নামেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির নেতারা। জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয়ের যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা ঠেকিয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ তৈরি হবে। গত দুই বছরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে।
শেষ মুহূর্তের প্রচারের জন্য ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুল এলাকা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীকে নতুন করে সাজানোর উচ্চাভিলাষী ও বিতর্কিত উদ্যোগের কারণে ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জায়গাটির বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
এর আগে রোববার ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘আমরা জিততে যাচ্ছি।’ এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, ‘দলটি ক্ষমতায় এলে সাধারণ পরিবারগুলোকে দেউলিয়া করে দেবে।’
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরাও শেষ মুহূর্তের প্রচার শুরু করেছেন। টেক্সাসে দলটির তারকা সিনেট প্রার্থী জেমস টালারিকো এবং কানসাসের প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচার শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তীব্র উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্য দিয়ে এবারের নির্বাচনী প্রচার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা
সর্বশেষ জরিপগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে রয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেড়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তাদের প্রায় নিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমানে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের বাস্তব সুযোগ রয়েছে দলটির।
ডেমোক্র্যাটরা শুধু প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলেও তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, কেন্দ্রীয় বাজেটের ওপর ভোট দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে তাদের হাতে। পাশাপাশি শক্তিশালী বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ, এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য বিতর্কিত বিষয় তদন্তের সুযোগ পাবেন তারা।
কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পকে অপরিচিত এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অচলাবস্থা এবং ওয়াশিংটনে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত—সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ দুই বছর কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে—এমন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের প্রায় সবকটিতেই রিপাবলিকানদের চেয়ে এগিয়ে আছে ডেমোক্র্যাটরা। জরিপে দেখা গেছে, টেক্সাস ও কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর এবং কানসাসে ১৯৩২ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের বর্তমান সব আসন ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের দখলে থাকা অন্তত চারটি আসন জিততে হবে। এই লড়াইকে কঠিন মনে করা হচ্ছিল। কারণ, ডেমোক্র্যাটদের যেসব আসন জিততে হবে, তার অনেকটিই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি। তবে সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে রিপাবলিকান সিনেটর আছেন—এমন পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে। ষষ্ঠ অঙ্গরাজ্যে দুই দলের প্রার্থীর অবস্থান প্রায় সমান।
কানসাস, মেইন, ওহাইও ও টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে। আলাস্কায় তাদের ব্যবধান সামান্য। আর আইওয়ায় দুই দলের প্রার্থীর মধ্যে কার্যত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা মিশিগানে দলটির প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ প্রায় দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
মিশিগানের জরিপটি করা হয়েছিল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভেদ শুরু হওয়ার আগে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানানোর মধ্য দিয়ে এই বিভেদ শুরু হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ট্রাম্পের বিচার বিভাগের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার বিভাগ মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপের আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশক ধরে চলে আসা প্রথা ভাঙল।
ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট বাতিলের আবেদন জানিয়েছে বিচার বিভাগ। বিভাগটির অভিযোগ, এসব ভোটারের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এবং সে কারণে তাদের ভোট দেওয়ার যোগ্যতা নেই।
এ-সংক্রান্ত একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথিও চেয়েছে বিচার বিভাগ। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ বলেছে, অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সঙ্গে ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের নেই বলেও যুক্তি দিয়েছে রাজ্যটি।
আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সালিভানের সঙ্গে একই নামের এক প্রার্থী ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন কি না, তা নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত জোরদার করেছে বিচার বিভাগ।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর আকস্মিক সিদ্ধান্তে চাঞ্চল্য
মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট হেইলি স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দিয়েছেন। বিষয়টি গত শনিবার রাত পর্যন্তও ছিল অকল্পনীয়।
স্টিভেন্স এর আগে এক বিবৃতিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের বক্তব্যের প্রশংসা করেছিলেন। এ ছাড়া প্রাইমারি নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী এল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারেন—এমন জল্পনা এক সপ্তাহ ধরে চললেও স্টিভেন্স বারবার বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
গত সপ্তাহে তার কয়েকজন সহযোগী রজার্সকে সমর্থন না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে যোগাযোগও করেছিলেন। স্টিভেন্স তাদের একজনকে খুদে বার্তায় লিখেছিলেন, ‘আপনারা কেন ভাবছেন যে আমি এমনটা করব?’
গত শনিবার মধ্যরাতেও তিনি নিজের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্রকে জানিয়েছিলেন, এল-সাইয়েদের প্রতিই তার সমর্থন বহাল থাকবে। তবে রোববার সকালে পরিস্থিতি বদলে যায়। সাংবাদিকদের কাছে এবং সামাজিক মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা জানান তিনি। এল-সাইয়েদের বদলে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন।
স্টিভেন্সের এ সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। স্টিভেন্সের এই সমর্থন মিশিগানের সিনেট নির্বাচনের ভোটের ফলাফলে আদৌ কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা।