জাতীয় সংসদে ঋণখেলাপি ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সরকার ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংসদে ঋণগ্রস্ত সংসদ সদস্য থাকলেও ঋণখেলাপি নেই।
জাতীয় সংসদে ঋণখেলাপি ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সরকার ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংসদে ঋণগ্রস্ত সংসদ সদস্য থাকলেও ঋণখেলাপি নেই।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আগেই ঋণখেলাপিদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। সংসদে ঋণখেলাপিদের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাও এই সংসদকে ঋণখেলাপিদের বলে মন্তব্য করেন। গতকাল স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা ঋণখেলাপি ইস্যুতে বিতর্কের সূত্রপাত করেন।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইন অনুযায়ী যেমন রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডারসহ অন্য বিধিমালায়, যদি কেউ আদালত কর্তৃক ঋণখেলাপি হিসেবে সাব্যস্ত বা ঘোষিত হন, তবে তিনি অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন, এমপি পদে মনোনয়ন পেতে পারেন না। সেটি স্পষ্ট বিধান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাদের কারো বিরুদ্ধে ব্যাংক বা অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মামলা থাকলেও, সেগুলো হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আদালত থেকে নিষ্পত্তির পর এবং বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর তিনি আর ঋণখেলাপি থাকেন না। সুতরাং এটিকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলা সঠিক নয় এবং এটি মানহানিকর বক্তব্য।
এর আগে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংসদে যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঋণখেলাপি সদস্য থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে। জনগণ মনে করতে পারে, এই সংসদে ঋণখেলাপিদের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিশেষ করে সরকারদলীয় সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে এমন আলোচনা জনপরিসরে আরো বেশি গুরুত্ব পাবে। তাই ঋণখেলাপির মতো গুরুতর বিষয়গুলো নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।’
সর্বশেষ পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কিভাবে ঋণ পুনঃ তফসিল (রিশিডিউলিং) করা হয় এবং উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে নির্বাচন করা হয়, তা সবারই জানা। টিআইবি সমপ্রতি তথ্য দিয়েছে, চলতি সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।
এ বাজেট দেশকে নতুন উচ্চতায় নেবে : বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করবে।
তিনি বলেন, একসময় বাজেট উপস্থাপনের পর ‘গরিব মারার বাজেট’ কিংবা ‘বড়লোকের বাজেট’ বলে সমালোচনা করা হতো। কিন্তু এবারের বাজেটকে ঘিরে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কারণ এই বাজেট গরিব, মধ্যবিত্ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি কোনো এক দিনের চিন্তার ফল নয়।
বাজেটকে স্বপ্নবিলাসী ও উচ্চাভিলাষী বলে সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী বলেন, যে জাতি স্বপ্ন দেখতে পারে না, সে জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। উচ্চাভিলাষ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।
মন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অর্থপাচার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সরকার বাস্তবমুখী ও উন্নয়নবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর-সুবিধা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জনগণের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
সবার আগে বগুড়া : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, ‘নিন্দুকেরা বলে, একসময় বলা হতো সবার আগে গোপালগঞ্জ। এখন কি আমরা বলব সবার আগে বগুড়া? আমরা এই বাংলাদেশ চাই না। সবার আগে বাংলাদেশ হলে, প্রতিটি প্রান্তের মানুষের জন্য সমান ধরনের বাজেট থাকতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইদানীং নিন্দুকেরা বলে, নতুন একটা উপজেলার আবির্ভাব ঘটেছে—এটাকে নবাবী উপজেলা বলা হচ্ছে। আমি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কথা বলতেছি, যেখানে অন্যান্য এলাকায় বাজেট পায় না, সেখানে এক উপজেলায়, কী এক ক্যারিশমাটিক মিরাক্কল, সেখানে ৭৬ কোটি টাকা চলে যায়!’
প্রতিরক্ষা খাতের বাজেটের বিষয়ে আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ ও অস্ত্র থাকত, আধুনিক অস্ত্র থাকলে আমাদের লোক দিয়ে, একক কর্তৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারতাম। রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানকে যুদ্ধের সময় ভারতের পক্ষ থেকে একটা ভাঙা ওয়ারলেস দেওয়া হয়েছিল। রাগ করে ফেলে দিয়ে ভারতীয় কমান্ডোকে তিনি বলেছিলেন, অস্ত্র যখন দিবা, সরঞ্জামাদি যখন দিবা, তখন এমন জিনিস দাও, যেটা ফাংশন করে, ডিসফাংশানাল দিয়ো না।’