একটি রাষ্ট্রের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নির্ভর করে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে। গণতন্ত্র, জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার যত বেশি সংকুচিত হবে, গণমাধ্যম তত বেশি চাপে পড়বে। প্রভাবশালীদের চাপে অনেক ধরনের নিউজ প্রকাশ করা যায় না। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে হয়রানি, গ্রেপ্তার কিংবা মালিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বাধার আশঙ্কা থাকবে না।
রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর শেষ দিনে গতকাল শনিবার এসব বক্তব্য উঠে আসে। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের আয়োজক ছিল মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। দেশি-বিদেশি ৫৪৭ সাংবাদিক, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এতে অংশ নেন।
গতকালের উদ্বোধনী অধিবেশনটি ছিল ‘রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত গণমাধ্যম’ বিষয়ে। এতে মূল বক্তা ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বক্তব্য দেন পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ ও বিবিসি বাংলার সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। অধিবেশন পরিচালনা করেন ইংরেজি দৈনিক টিবিএসের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন।
সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের একাংশ – সমকাল
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গণতন্ত্র, জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার যত বেশি সংকুচিত হবে, গণমাধ্যমও তত বেশি চাপে পড়বে।
ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। সুইডেন, নরওয়ের মতো দেশ থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারছি না।’
শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো, অনেক সাংবাদিক বিট কাভার করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই সংশ্লিষ্ট দলের সঙ্গে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। অথচ একজন রিপোর্টারের পরিচয় হওয়া উচিত কেবল সাংবাদিক হিসেবে– ‘আমি আওয়ামী লীগ কাভার করতে এসেছি, বিএনপি কাভার করতে এসেছি বা জামায়াত কাভার করতে এসেছি।’ তিনি বলেন, অনেক সময় রাজনৈতিক বিটে এমন সাংবাদিকদের দায়িত্ব দিতে হচ্ছে, যাদের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সফট কর্নার রয়েছে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোরও নিজেদের পছন্দের সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করার প্রবণতা আছে।
প্রভাবশালীদের চাপে সংবাদ প্রকাশ আটকে যায়
দ্বিতীয় অধিবেশনটি ছিল ‘বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ: পেশাগত তত্ত্বাবধান, জবাবদিহি ও অভিযোগ প্রতিকার’ বিষয়ে। এতে বক্তব্য দেন টাইমস মিডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ। বিবিসি বাংলার সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল আনোয়ারের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন গণমাধ্যমের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. জোয়ান বারাতা, ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ ও প্রথম আলো ওয়েবের (ইংরেজি) টিম লিডার আয়েশা কবির।
সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার কয়েকটি কারণ তুলে ধরে এ. কে. আজাদ বলেন, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের আগে সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিতে হয়। আর তখন থেকেই চাপ শুরু হয়। যার বিরুদ্ধে সংবাদ হবে, প্রথম ফোনটা তার দিক থেকে আসে। এতে কাজ না হলে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করা হয়।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম মালিকদের ওপর এমন চাপ তৈরি হয়, যেখানে সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার আটকে দেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে সংকট তৈরি হয়। অনেক সময় তিনি নিজেই সাংবাদিকদের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। কিন্তু তখন সাংবাদিকদের কাছ থেকে তিনি কঠিন প্রতিক্রিয়া পান। সাংবাদিকরা জানান, যদি সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ না করা হয়, তাহলে তথ্যদাতা মনে করতে পারেন কোনো বিনিময়ের মাধ্যমে সংবাদটি গোপন রাখা হয়েছে। এতে সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে যদি গণমাধ্যম মালিকদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় যেখানে হয়রানি, গ্রেপ্তার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক বাধার আশঙ্কা থাকবে না; তাহলে মালিকপক্ষও সাংবাদিকদের কাজের ওপর অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে না।
যুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাই প্রথম শিকার হয়
গতকাল বিকেলের এক আলোচনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যুদ্ধকালীন জাতীয়তাবাদ, আর্থিক চাপ এবং ডিজিটাল রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস। ‘স্পিকিং ট্রুথ টু পাওয়ার: আ স্টোরি অব ইন্ডিপেনডেন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাই প্রথম শিকার হয়। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে কেউই এমন কিছু লিখতে চায় না, যা জাতীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে যায়। সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক কামাল আহমেদের সঞ্চালনায় এই অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যান্য অধিবেশন
দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সম্মেলনের বিভিন্ন ভেন্যুতে আরও তিনটি অধিবেশন হয়। মল্লিকা হলে নির্ধারিত ‘মাস্টারক্লাস: বিগ ডেটা টার্নিং নাম্বার্স ইনটু ইমপ্যাক্টফুল স্টোরিজ’শীর্ষক কর্মশালাটি অনিবার্য কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি। এর পরিবর্তে একই ভেন্যুতে জাফর আব্বাসের অধিবেশনটি হয়।
লহরী হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন নিউজরুমস: ইনোভেশন, ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড এথিকস’ শীর্ষক সেশন। এতে সংবাদকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, সাবেক নির্বাহী সম্পাদক মারডক ডেভিস ও ডেইলি স্টারের উপসম্পাদক অরুণ দেবনাথ।
অন্তরা হলে ‘বিহাইন্ড দ্য বাইলাইন’ সেশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের নেপথ্য গল্প ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন এমআরডিআইর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অ্যান্ড আইজে হেল্প ডেস্কের প্রধান বদরুদ্দোজা বাবু, সাংবাদিক আসাদুজ্জামান এবং ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জাইমা ইসলাম। বদরুদ্দোজা বাবু তাঁর ‘গৌরী সেন’শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট এবং জনস্বার্থের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কথা বলেন। আসাদুজ্জামান সাইবার মামলা নিয়ে এবং জাইমা ইসলাম এস আলমের বিদেশে সম্পদ পাচার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।
মাধবী হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘ফর দ্য রাইজ অব ইন্ডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম স্টার্টআপস’শীর্ষক অধিবেশন। ডেইলি স্টারের ডিজিটাল সম্পাদক তানিম আহমেদের সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন জুলিয়ান শের, আশরাফুল হক ও এস কে তানভীর মাহমুদ। এমআরডিআইর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।