তেলের লাইনে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেলের ওপর ঘুমাচ্ছিলেন ২১ বছরের তরুণ সাইমুন ইসলাম। হেলমেট তাঁর গাড়ির সামনে ঝোলানো। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে কড়া রোদ থেকে বাঁচতে মাথার ওপর ছাতার ছায়া। কাছে যেতেই চোখ খোলেন তিনি।
চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সাইমুনের ভাষায় এটি ঠিক ঘুম নয়, ‘ন্যাপ’। বাংলায় যাকে তন্দ্রা বলে, ঈষৎ নিদ্রা।
এর মাঝেই সামনের গাড়ি একটু এগিয়ে গেলে পুরো লাইনজুড়ে সাড়া জাগে। সবাই আরেকটু এগিয়ে যান। তেল পাবেন সেই আশা বাড়ে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের পাশে এমন চিত্র দেখা যায়। সেখানেই লাইনে ছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের সাইমুন। ঢাকায় তিনি তেজকুনিপাড়ায় থাকেন।
বিকেল ৪টার দিকে সাইমুন বলেন, ‘রোদের মধ্যে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে এখনও তেল পাইনি। কখন মিলবে, তাও জানি না। এখনও দুপুরের খাবার খাইনি। কেক, পানি, ঝালমুড়ি খেয়ে আছি। লাইনে দাঁড়ানোর মধ্যে ফাঁকে ফাঁকে চোখ বন্ধ রাখি। একটু ন্যাপ নিই।’
চারদিকে গাড়ির হর্ন আর মানুষের ছুটে চলার অনুভূতি ছাপিয়ে কত সময় পর কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি তেল পাবেন– সেই চিন্তায় সাইমুন। সকাল পেরিয়ে দুপুর, আবার দুপুর পেরিয়ে বিকেল, বিকেলের পর সন্ধ্যা, তারপর রাত; তখনও জ্বালানি তেলের লাইনে সাইমুন।
সাইমুন বলেন, “ইউটিউবে দেখেছি, কীভাবে বিরূপ পরিবেশে মানিয়ে নিতে মেডিটেশন করতে হয়। চোখ বন্ধ করে ঘুমের মতো থাকছি। এতে আমি শক্তি পাই। এই যে কষ্ট করছি, এটি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কথায় আছে না– ‘এনজয় দ্য পেইন’। কষ্টকে উপভোগ করতে হয়। বিষয়টি অনেকটা সে রকম।”
সাইমুন বলেন, ‘ওই দেখেন, মোটরসাইকেলের সঙ্গে একটি ব্যাগে পানির বোতল ঝোলানো। দুই লিটার পানি নিয়ে বের হয়েছিলাম। পুরো পানি শেষ করেছি। দরকার হলে কিনে খাব।’
তেজগাঁওয়ে যখন প্রথম দফায় কথা হয় তখন সাইমুন জানান, ফার্মগেটের তেজকুনিপাড়ার বাসা থেকে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বের হন তিনি। তেলের জন্য পাম্পের কাছাকাছি গিয়ে দেখেন দীর্ঘ সারি। আশপাশের যারা লাইনে দাঁড়িয়েছেন কখনও তাদের সঙ্গে গল্প করে, আবার কখনও গাড়ির ওপর চোখ বন্ধ করে কাটিয়ে দিয়েছেন।
সাইমুন জানান, ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিতে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে মহাখালী রেলস্টেশনের কাছাকাছি সিরিয়াল পান তিনি। ধীরে ধীরে আট ঘণ্টা পর তেজগাঁও এলাকায় বিমানবাহিনীর অফিসার্স কোয়ার্টারের সামনে পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন। রোদ থাকার কারণে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছাতা নিয়ে এসেছেন। লাইনে দাঁড়ানো একেকজন মানুষের কষ্টের গল্প শুনতে শুনতে সময় পার হয়।
সাইমুন জানান, ফার্মগেটের একটি মেসে থাকেন তিনি। পেশায় তিনি প্রাইভেটকার চালক। তাঁর মালিক সাইফুল ইসলাম টাইগার আইটি নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। যে মোটরসাইকেল নিয়ে সাইমুন লাইনে দাঁড়িয়েছেন, সেটি তাঁর নিজের। খালাতো ভাই সাইফুল ইসলামের বিয়ে উপলক্ষে শুক্রবার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে যাবেন তিনি। এ জন্য মোটরসাইকেলে তেল নিতে এসেছেন।
সাইমুন জানান, তাঁর বাবা মুদি দোকানি। ঝিনাইদহ সরকারি মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন তিনি। ঢাকায় প্রাইভেটকার চালানোর পাশাপাশি পড়াশোনা করেন। পরীক্ষার জন্য ছুটি নিয়ে বাড়ি যান। চাকরিতে ডিউটি কম থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তাঁর কোনো সমস্যা হয় না। এ ছাড়া গাড়িতে সব সময় তাঁর বই থাকে। বেতনের টাকায় একমাত্র বোনের পড়াশোনার খরচও চালাচ্ছেন সাইমুন। বাড়ি থেকে আসা-যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলটি ৯০ হাজার টাকায় কিনেছেন সাইমুন।
রাত পৌনে ৯টার দিকে সাইমুনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘১২ ঘণ্টা পর রাত সোয়া ৮টার দিকে তেল পেয়েছি। ফুয়েল কার্ড থাকায় ১০ লিটার তেল দিয়েছে।’