তিনি বলেন, আমরা শুধু একলাইনে চলতে থাকলাম, এটার সমাধান কিভাবে হবে, তা আমরা সবাই বুঝি। আমরাও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চাই। সংস্কার পরিষদের ওপর যে আলোচনা হলো, তাকে একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে সেখানে আমাদের আহবান থাকবে, সরকারি ও বিরোধী দল—দুই দিক থেকেই সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে।
সংসদ ও সংবিধানের মূল উদ্দেশ্য জনগণের কল্যাণ—এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশ এবং জাতির জন্য সংবিধান এবং এই সংসদ। আমরা কে সরকারি বেঞ্চে, আর কে বিরোধী বেঞ্চে—এটা কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে যাঁরা একসময় ওখানে বসতেন, আজ তাঁরা কোথাও নেই। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা দলের নয়, জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাতে এখানে এসেছি।’
পার্লামেন্টে নিজেকে ‘চার দিনের শিশু’ আখ্যা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আইন বা সংবিধান মানুষের জন্য, জনগণের জন্য; মানুষ বা জনগণ আইন কিংবা সংবিধানের জন্য নয়।
এ সময় সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই মহান সংসদে ওই বিষয়ে সময় নষ্ট করার কোনো দরকার ছিল না। মহৎ লক্ষ্যে কাজ করতে গেলে এমন সংকট নিরসন করা সরকারেরই দায়িত্ব ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সরকারকে গঠনমূলক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রথম দিনই বলেছিলাম, আমরা একটি গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। বিরোধিতার খাতিরে কোনো বিরোধিতা নয়; বরং যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন, সেখানে সহযোগিতা করব এবং জাতির অধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনে বিরোধিতা করব।’
এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, যে নোটিশটি বিরোধীদলীয় নেতা উত্থাপন করেছেন, তার মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহবান প্রসঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিষদের অধিবেশন কেন রাষ্ট্রপতি আহবান করলেন না? জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অন্তহীন প্রতারণার দলিল।
রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা ও আইনি বৈধতা নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আর আদেশ জারির ক্ষমতা রইল না। তার পরও রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করলেন কিভাবে? যে আদেশের জন্মই বৈধ হলো না, সেই আদেশ লিগ্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ সূচনা থেকেই অবৈধ। এই আদেশটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ না হওয়ার কারণে সংসদের প্রথম দিনে উপস্থাপন করা হয়নি।”
গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সারা জাতির মধ্যে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না বা বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে ছিলাম এবং আছি। এই সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আমরা ধারণ করি। কিন্তু যে আদেশটি (সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ) নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, সেটি আমরা মানছি না। কারণ এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
গণভোটের ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল এবং জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই চারটির মধ্যে তিনটি প্রশ্নের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের মিল আছে, কিন্তু একটির সঙ্গে নেই। আপনি জাতিকে এভাবে জোর করে কোনো আইন গেলাতে পারেন না।” তিনি বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান ছিল না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথের ফর্ম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। এটি সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার প্রতিপালনের আহবান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা সরকারি দল, বিরোধী দল—সবাইকে নিয়ে মহান জাতীয় সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চাই। তাই আমি সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) পক্ষে প্রস্তাব রাখছি, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটিতে সবার আলোচনার ভিত্তিতে একটি সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হোক।’
বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ধারণ করি। আমরা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলের ভিত্তিতে সংস্কার চাই, কোনো অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে নয়।’ এ সময় তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দেশের জনগণ বিএনপিকে ৫১ শতাংশ ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবকে স্বাগত জানানোয় বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তবে সমানসংখ্যক সদস্যের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, বিরোধী দলের নেতাও তা ইনডিরেক্টলি গ্রহণ করে বলেছেন সদস্যসংখ্যা ৫০-৫০ হলে ভালো হয়। মাননীয় স্পিকার, বিচার মানেই তালগাছটা আমার, এটা তো হতে পারে না! সংসদে ২১৯ জন সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিরা পাবেন ৫০ শতাংশ, আর ৭৭ জনের প্রতিনিধিরা পাবেন ৫০ শতাংশ, এটা পৃথিবীর কোন জায়গায় আছে? এটা কি বৈষম্য নয়? এটা কোন আইনে আছে?’ তিনি বলেন, সব ধরনের সংস্কার সংবিধানের কাঠামোর ভেতরেই পরিচালিত হবে।
এরপর আইনমন্ত্রী স্পিকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ‘আপনি একটি কমিটি গঠন করে দিন। এই সংসদ একটি কমিটি গঠন করুক, সেখানে আমরা সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জুলাই সনদের পথ ধরে এমন একটি সংশোধনী আনব, যা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে।’
যাঁরা বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান, তাঁদের কড়া সমালোচনা করেন ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন? এই সংবিধানে এত গাত্রদাহ কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয়, এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল?’ তিনি বলেন, ‘জুলাই নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনারা যদি সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে বানাতে চাইতেন, তাহলে সেই সময় রেভল্যুশনারি (বিপ্লবী) বা ট্রানজিশনাল সরকার করলেন না কেন? একটি সাধারণ সরকারে থেকে, পুরনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধান বাতিল করতে চাচ্ছেন, এটা আসলে হয় না।’
যৌক্তিক প্রশ্ন তুললেই ‘জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তি’ বানানোর চেষ্টার সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি বলেন, ‘কেউ কথা বললেই তাকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর একটা পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আওয়ামী লীগ সরকারের কথা মনে করিয়ে দেয়।’
গণভোটের কারিগরি দিক নিয়েও সংসদে প্রশ্ন তোলেন পার্থ। তিনি বলেন, “আপনারা গণভোটে চারটি বিষয় দিয়েছেন, কিন্তু কোনো ভোটার যদি একটি বিষয়ে একমত না হয়, তবে সে কী করবে? ‘হ্যাঁ’তে ভোট দেবে নাকি ‘না’তে? আপনারা তো ভোটারদের বাধ্য করেছেন। সনদের বাকি বিষয়গুলো কেন গণভোটে দিলেন না?” জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’কে ‘জামায়াত জেনারেশন’ হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, “আপনারা জেন-জিকে রিপ্রেজেন্ট করেন। দয়া করে ‘জামায়াত জেনারেশন’ হয়ে যাইয়েন না।”
জনগণের প্রয়োজনে এই সংবিধান যেকোনো সময় সংশোধন বা সংস্কার করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, সংবিধান তো কোনো কোরআনের বাণী নয়, কোনো ওহি নয়। জনগণের জন্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। কাজেই জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান সংস্কার করায় কোনোই অসুবিধা থাকার কথা নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল, ক্ষমতায় গিয়ে বর্তমান সরকার তা ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। ওই সময় কোন সংবিধানের বলে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল? অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েছিল, যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ৬ তারিখে সংসদ ভেঙে দেওয়ারও কোনো সাংবিধানিক ফর্মুলা ছিল না। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে জনগণের যে অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যাতে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসে।
আইনমন্ত্রীর সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, আইনমন্ত্রী সংবিধান সংস্কার আদেশের এক্সপার্ট প্যানেলের সদস্য ছিলেন। তিনি নিজেই পরামর্শ দিয়েছিলেন কিভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। আর আজ আইনমন্ত্রী হয়ে তিনি সবকিছু বেমালুম ভুলে গেছেন! তাঁরা হবস, লক আর রুশো পড়ার কথা বলেন, কিন্তু নৈতিকতার পাঠ ভুলে গেছেন।
গণভোটের বিষয়ে আখতার হোসেন বলেন, জনগণ গণভোটের মাধ্যমে যে আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে, তাকে অসাংবিধানিক বলা এই সংসদকে কলঙ্কিত করার শামিল।
বিরোধীদলীয় সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “গত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে আমাদের নির্বাচনকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন আমরা দেখছি, আমাদের নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে আমরা আবার ‘জুলাই সনদ’টাকেই ভুলিয়ে দিতে বসেছি।”
যাঁরা বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান, তাঁদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বলেছিলেন, জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে। যাঁরা আজ সংসদে সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে টেবিল চাপড়াচ্ছেন, তাঁরা কি এর মাধ্যমে বেগম জিয়াকেই অপমান করলেন না? তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, উনি সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চায় তাদের স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইন (চিহ্নিত) করলেন। আর ট্রেজারি বেঞ্চের মাননীয় মন্ত্রীরা সেটাতে টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থন দিলেন। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন লড়াই করা বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, যেদিন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন এই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চের অনেক মন্ত্রী সারা জীবন বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। আজ যখন তাঁরা সংবিধান ছুড়ে ফেলার বিপক্ষে হাততালি দিচ্ছেন, তখন কি তাঁরা বেগম জিয়াকে অপমান করছেন না? এটা তাঁরা ভেবে দেখবেন।’