মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

রাজধানীতে দুর্যোগপূর্ণ বায়ু, সতর্কতা-পদক্ষেপ নেই

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার আকাশ প্রায় প্রতিদিনই ধূসর পর্দায় ঢেকে যাচ্ছে। ধুলা, ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাসের মিশ্রণে তিলোত্তমা এই নগরে বুকভরে শ্বাস নেওয়াই এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। সেই শীতের শুরু থেকে রাজধানীর বায়ুদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আন্তর্জাতিক সূচকে প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় উঠে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আড়াই কোটি মানুষের এই নগরের সামনে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা অস্থিরতার ভিড়ে এই পরিবেশগত সংকট তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। দূষণ নিয়ন্ত্রণে মাঠে কার্যত নিষ্ক্রিয় দুই সিটি করপোরেশন। আগের মতো সড়কে নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে না। দূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে চিহ্নিত পুরোনো যানবাহন, ইটভাটা কিংবা নির্মাণকাজও চলছে আগের মতো। সরকারি দপ্তরগুলোর পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

বায়ুমানের আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী, কোনো এলাকায় বায়ুমান সূচক (একিউআই) ৩০০ ছাড়ালে সেটিকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ অবস্থা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার কয়েকটি এলাকায় এই সূচক ৬০০-এর বেশি ছিল। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্বের ১২৪টি শহরের মধ্যে বায়ুদূষণে শীর্ষে ছিল ঢাকা। রাজধানীর সামগ্রিক বায়ুমান ছিল ২৯৮, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। ঢাকার পরেই ছিল পাকিস্তানের লাহোর (২৪৩) এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা (২১০)। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় দূষণের মাত্রা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর মধ্যে মিরপুরের সাগুফতা এলাকায় বায়ুমান ছিল ৬০৭, দক্ষিণ পল্লবীতে ৬০৩, উত্তর বাড্ডার আবদুল্লাহবাগে ৫৯৮, ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় ৫১৯, গুলশান লেক পার্কে ৫১৬ এবং গুলশানের বেজ এজ ওয়াটার এলাকায় ৩১৬। এ পরিস্থিতিতে আইকিউএয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী, বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি খোলা জায়গায় ব্যায়াম না করা এবং ঘরের জানালা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বিশ্বের অন্য দেশগুলো জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করে থাকে। তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বায়ুদষূণের কারণে কোনো সতর্কতা জারি করা হয়নি।

ঢাকায় সম্প্রতি বৃষ্টি হলেও দূষণের মাত্রা কমেনি। গত সোমবার রাজধানীতে ১১৪ দিন পর বৃষ্টি হয়। তবে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ মিলিমিটার। সাধারণত বৃষ্টি হলে বাতাসের ধুলা ও ক্ষতিকর কণা ধুয়ে যায় এবং বায়ুর মান কিছুটা উন্নত হয়। কিন্তু এবার সেই পরিবর্তন দেখা যায়নি। বৃষ্টির পরপরই আবার বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে ঢাকা। গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রায় পুরো সময়ই রাজধানী বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষে ছিল। চলতি মাসেও একই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে এর কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণা (পিএম২.৫) মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিতে গুরুতর প্রভাব ফেলে। এতে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগসহ নানা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে উচ্চ আদালত ৯ দফা নির্দেশনা দেন। এতে নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, রাস্তার ধুলা কমাতে পানি ছিটানো এবং খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত কঠোরভাবে মানার কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব নির্দেশনার খুব কমই বাস্তবায়ন হয়েছে। পরে একই বছরের নভেম্বরে আদালত নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে আবারও নির্দেশ দেন। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। মাঝেমধ্যে সড়কে পানি ছিটানো বা সভা-সেমিনারের আয়োজন ছাড়া বড় কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ নভেম্বর জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এতে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, বায়ুমান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং আইন প্রয়োগ শক্তিশালী করার কথা বলা হয়। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে লাইভ বায়ুমানের তথ্য প্রকাশ করা শুরু হয়। তবে স্বাস্থ্যসুরক্ষা সংক্রান্ত সতর্কবার্তা থাকলেও তা সাধারণ মানুষের কাছে বড় পরিসরে পৌঁছাচ্ছে না।

এদিকে শুষ্ক মৌসুমে প্লাস্টিক, পলিথিন ও কাগজ পোড়ানো ঢাকার বায়ুদূষণকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। এতে বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ঢাকার প্রধান বর্জ্য ডাম্পিং এলাকা। এসব স্থানে বর্জ্য পোড়ানোর কারণেই বর্তমানে রাজধানীর বায়ুদূষণ পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। তিনি জানান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে অবিলম্বে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে বলা হয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে পোড়ানো বর্জ্যের ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণা দ্রুত ছড়িয়ে পুরো শহরের বাতাসকে দূষিত করে তুলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের অবস্থা, দূষণের উৎস এবং সমাধানের উপায়– সবই জানা আছে। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমানে নির্মাণকাজ, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, যানবাহনে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র– এসবই বায়ুদূষণের প্রধান উৎস।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর চেয়ারম্যান ও পরিবেশবিজ্ঞানী আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণ সব সময়ই উদ্বেগজনক। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২ শতাংশ করে দূষণ বাড়ছে। মূলত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় স্থানীয় ইটভাটা, শিল্পকারখানা এবং বর্জ্য পোড়ানো দূষণের বড় উৎস হয়ে ওঠে। গবেষণা তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গত জানুয়ারি মাসে ঢাকার বায়ুদূষণ গত আট বছরের জানুয়ারির গড় মানের তুলনায় ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি ছিল। আর ফেব্রুয়ারি মাস ছিল আরও ভয়াবহ। গত আট বছরের ফেব্রুয়ারির গড় মানের তুলনায় দূষণ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, কোনো এলাকায় পরপর তিন দিন তিন ঘণ্টা যদি বায়ুর মানসূচক ৩০০-এর বেশি থাকে, তাহলে ওই এলাকায় বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এটা আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা পরিবেশ মন্ত্রণালয় কিংবা উভয়ে মিলে নিতে পারে। এই জরুরি অবস্থার সময়ে, বিশেষ করে স্কুল-কলেজগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা, দূষণকারী শিল্পকারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ, যান চলাচলে কঠোরতা জারি এবং স্বাস্থ্যগত সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com