যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে। আর এর ছোবলে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে বাংলাদেশে। জ্বালানি দিয়ে সংকটের সূচনা হতে শুরু করলেও ক্রমেই তা সার্বিক অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে এক জ্বালানিসংকটই পুরো অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে।

যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে। আর এর ছোবলে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে বাংলাদেশে। জ্বালানি দিয়ে সংকটের সূচনা হতে শুরু করলেও ক্রমেই তা সার্বিক অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে এক জ্বালানিসংকটই পুরো অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। অপরিশোধিত তেলের পুরোটা আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে নিজেদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলার অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিং তাদের অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলোকে ডিজেল ও পেট্রল রপ্তানি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এতে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ।
গ্যাসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম। দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করা হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে। এই এলএনজির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের কাতার ও ওমান থেকে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গতকাল বৃহস্পতিবার এলএনজিসহ মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৬৫৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৯৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে এলএনজির মাধ্যমে। বাকি অংশ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করে সরবরাহ করা হয়। চাহিদা ও সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের ঘাটতি আরো বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালি ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
গ্যাস সরবরাহে রেশনিং শুরু : জ্বালানিসংকটের আশঙ্কায় এরই মধ্যে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং কার্যক্রম শুরু করেছে পেট্রোবাংলা। পরিস্থিতি সামাল দিতে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগামী সাত দিনে প্রায় এক হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলে শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে ভোগান্তি বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবির) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহে রেশনিং শুরু হওয়ায় আগামী সপ্তাহ থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করে বিদ্যুতের লোড ম্যানেজমেন্ট শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকেও পরিস্থিতি বিবেচনায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহবান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকেই আসছে। এখন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।’
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ রেশনিং করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। হয়তো একটি সার কারখানা থাকতে পারে। গ্যাসসংকটের কারণে বিদ্যুতে সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি সার কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এলএনজি আমদানিতে অনিশ্চয়তা : পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি মার্চ মাসে মোট ৯টি এলএনজি কার্গো আমদানির কথা রয়েছে। কয়েকটি জাহাজ এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বাংলাদেশমুখী হয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পরবর্তী কয়েকটি কার্গোর আগমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে কাতার থেকে আসার কথা থাকা দুটি এলএনজি কার্গো নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কাতার কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে বাংলাদেশকে জানিয়েছে যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। বিশ্ববাজারে এলএনজির দামও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১২ ডলার, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে ২৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
জ্বালানি তেলের মজুদ কমছে : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের মজুদ ধীরে ধীরে কমে আসছে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুদ রয়েছে প্রায় ৯ দিনের। পেট্রলের মজুদ প্রায় আট দিনের এবং অকটেনের মজুদ রয়েছে প্রায় ১৫ দিনের। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের মজুদ রয়েছে প্রায় ৬০ দিনের। ডিজেলের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ডিজেল পাচারের সম্ভাবনাও তদন্ত করা হচ্ছে। এ জন্য সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে সেখানে ডিজেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হতে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে ৮৪ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ৮৮ ডলার থেকে বেড়ে ১৩৭ ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাড়ছে ভর্তুকির চাপ : জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচে। এতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও বেড়ে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ছিল প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ভর্তুকির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ : বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগের নজির স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে এসে তিনি কক্ষের অর্ধেক লাইট বন্ধ করে দেন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা ২৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নির্ধারণ করেন।
তিনি সরকারি অফিস, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শপিং মল ও অন্যান্য ভবনেও একই ধরনের সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি কমে গেলে শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও চলমান বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; বৈশ্বিক বাজারে সবাই এখন জ্বালানি সংগ্রহে প্রতিযোগিতায় আছে। আমরা স্পট পারচেজেও গেছি, তবে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাই যতটুকু মজুদ আছে, তা সাশ্রয় করে ব্যবহারের বিকল্প নেই।’
দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের পরামর্শ : এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের তাগিদ দিয়েছেন দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে বর্তমান সংকট বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর ও ঋণ চাপে থাকা জ্বালানি খাতের ঝুঁকি আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানি ব্যয়, ভর্তুকি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
গ্যাসসংকটে দেশের ৬ সার কারখানার ৫টি বন্ধ : তীব্র গ্যাসসংকটে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশে সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই কারখানাগুলো হলো ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার, যমুনা ফার্টিলাইজার ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কম্পানি। বর্তমানে শুধু শাহজালাল ফার্টিলাইজার কারখানার উৎপাদন চালু আছে। বেসরকারিভাবে পরিচালিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কম্পানি লিমিটেডও (কাফকো) গ্যাসসংকটে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
গতকাল সন্ধ্যায় বিসিআইসি পরিচালক (উৎপাদন ও গবেষণা) মনিরুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সরকারি পাঁচটি কারখানার দৈনিক মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় সাত হাজার ১০০ টন। শাহজালাল ফার্টিলাইজারের উৎপাদনও যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই পাঁচ কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
পাম্পে গাড়ির লাইন, বেশির ভাগই নিচ্ছে ফুল ট্যাংক : রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে গতকাল সকাল থেকে যানবাহনের ভিড় ও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালক অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় ট্যাংক পূর্ণ করে জ্বালানি নিচ্ছেন। এতে পাম্পগুলোর মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে রাজধানীর অন্তত দুটি পাম্পে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও খোলা ড্রাম বা বোতলে ডিজেল বিক্রিও বন্ধ রাখা হয়েছে।