শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষা খাতে অনেক কিছু আছে।
বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা এবং পুষ্টি উন্নয়নে নির্বাচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পটি গত ১৫ নভেম্বর শুরু হয়।
প্রত্যেক সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসে ফর্টিফায়েড বিস্কুট, কলা বা মৌসুমি ফল, বনরুটি, ডিম এবং ইউএইচটি দুধ তথা পুষ্টিকর খাবার পাবে শিশুরা। রবিবার ১২০ গ্রাম ওজনের বনরুটি এবং সিদ্ধ ডিম, সোমবার বনরুটি এবং ২০০ গ্রাম ইউএইচটি দুধ, মঙ্গলবার ৭৫ গ্রাম ওজনের ফর্টিফায়েড বিস্কুট এবং কলা বা স্থানীয় মৌসুমি ফল, বুধবার এবং বৃহস্পতিবার বনরুটি ও সিদ্ধ ডিম দেওয়ার কথা।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের অধীনে ১৫০টি উপজেলার স্কুল ফিডিং কার্যক্রমকে ২০টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নভেম্বরের শুরুতে আটটি প্যাকেজের দরপত্রের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই দরপত্রেই বড় ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়। দরপত্রের শর্তে ছিল, সরকারি কাজে একক অর্ডারে খাদসামগ্রী সরবরাহে কমপক্ষে ১৮ কোটি টাকার কাজ করতে হবে অথবা ৬৫ কোটি টাকার ‘গুডস’ সরবরাহের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু দরপত্রের শর্ত পূরণ না করেও কাজ পেয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান। এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রকল্প ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমেই কাজ দেওয়া হয়েছে। এমনকি এই প্রকল্পে কাজ পাওয়া বেশির ভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠজন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাজমুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় ১১৪টা স্কুল। এই স্কুলগুলোতে এখনো দুধ ও বিস্কুট দেওয়া শুরু হয়নি। শুধু ডিম, পাউরুটি ও কলা দেওয়া হয়। তবে ডিম দেওয়া হয় কাঁচা। আমরা শিশুদের ডিম দিয়ে দিই, তবে সেটা নেওয়ার সময় বেশির ভাগই ভেঙে যায়। অনেক সময় পাউরুটিতে মেচতা পড়া থাকে, আবার অনেক শক্ত থাকে। আর কলার ক্ষেত্রে কিছু কাঁচা আবার কিছু বেশি পাঁকা থাকে যেগুলো থেঁতলে যায়। তবে আমরা সরবরাহকারীদের বারবার বলেছি। আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আমরা ডিমটা আশপাশের কাউকে দিয়ে সিদ্ধ করে দিতে বলেছি। তবে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ ছাড়া এই মিড ডে মিলের সফলতা পাওয়া কষ্টকর।’
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার পূর্ব বয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মইনুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বনরুটি বাসি থাকে, বাচ্চারা খেতে চায় না। কলাগুলো ভালো থাকে না। আবার মাঝেমধ্যে ব্রেকডাউন হয়। এতে বাচ্চাদের সারা দিন না খেয়ে থাকতে হয়। কারণ শিশুরা তো জানে না আজ মিড ডে মিল আসবে না। ফলে তারা টিফিন নিয়ে আসে না। আবার অনেক সময় বিকেলে দেয়। কিন্তু তখন ওয়ান, টুর শিশুদের ক্লাস ছুটি হয়ে যায়।’
খাবার সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠান আইল্যান্ড ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা উপজেলা পর্যায়ে সাব-কন্ট্রাকটরের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করি। আপনি যেহেতু খাবারের মান নিয়ে জানালেন, অবশ্যই খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। বাচ্চাদের যাতে কোনো ধরনের মানহীন খাবার দেওয়া না হয়, সে ব্যবস্থা আমরা নেব। আর দরপত্রের শর্তানুযায়ী সব শর্ত পূরণ করেই আমরা এই প্রকল্পের কাজ পেয়েছি। আগে আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও খাবার সরবরাহ করেছি।’
জানা যায়, প্রকল্পের অধীনে ১৫০ উপজেলার প্রত্যেকটিতে দুজন করে স্টাফ থাকার কথা। এ জন্য আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নিয়োগ দিতে দরপত্র ডাকা হয়। এতে ১৬টি কম্পানি অংশ নেয়। কিন্তু এর কোনোটিকেই কার্যাদেশ না দিয়ে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ফলে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।
প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে পিডি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে গতকাল একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। এসএমএস পাঠালেও তিনি জবাব দেননি।
স্কুল ফিডিং প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত শিক্ষা অর্জনে সহায়তা এবং পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে তাদের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন সাধন করা। এতে বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতির হার বাড়বে এবং ঝরে পড়ার হার কমবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। সারা দেশে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।