২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে সুপারশপ ও নভেম্বর থেকে কাঁচাবাজারে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এ ঘোষণা কার্যকর করতে অভিযান পরিচালনা করে সরকার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পলিথিন জব্দও করা হয়। তবে কাজের কাজ কিছু হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পলিথিন ব্যাগের বিকল্প পণ্য আনার ব্যাপারে প্রশাসন-ব্যবসায়ী কেউ আন্তরিক নন। নামমাত্র অভিযান, বিকল্প পণ্য না আনা, পলিথিনের সহজলভ্যতায় পলিথিনের ব্যবহার কমছে না। পলিথিনের বিকল্প পণ্য পেলে ব্যবহার কমিয়ে দেবেন বলছেন ব্যবহারকারীরা।
সরেজমিনে রাজধানীর মুগদা, বৌদ্ধ মন্দির, মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি সবজির দোকান, মুদি ও মাংসের দোকান পলিথিন ব্যাগে সয়লাব।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) পরিবেশবিষয়ক এক জরিপে সম্প্রতি উঠে এসেছে, পরিবেশের জন্য ক্ষতি জেনেও দেশের ৬৩ শতাংশ মানুষ পলিথিন ব্যাগ ও এ ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করছেন। তবে পলিথিন থেকে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হলে ৫৫ শতাংশ খুচরা বিক্রেতা পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার করতে ইচ্ছুক।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল প্লাস্টিকের ব্যাগ বাজারে আনার চেষ্টা চলছে।
প্লাস্টিক পণ্য ও পলিথিন ব্যাগের পবিবেশগত ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় ২০০২ সালে সর্বপ্রথম এসব নিষিদ্ধ করে তত্কালীন সরকার। ওই বছর ১ মার্চ আইন করে বিষাক্ত পলিথিন উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১০ সালে আরেকটি আইন করে সরকার। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে পলিথিন উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার আবার নিষিদ্ধ করে সরকার।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে, ‘পলিথিনের ব্যবহার আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এটি ছাড়া চলতে পারি না। এর মধ্যে অন্তত সুপারশপগুলোতে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে পেরেছি। অভ্যাসের পরিবর্তন হলে এসবের ব্যবহার অনেকাংশে কমে আসবে।’
সরকারি উদ্যোগের এত বছর পরও পলিথিন উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে না কেন? এ ব্যাপারে জিয়াউল হক বলেন, ‘প্লাস্টিকের বিভিন্ন জিনিস তৈরির উদ্দেশ্যে এসব কাঁচামাল আমদানি করা হয়। সেটিকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু ব্যবসায়ী পলিথিনের ব্যাগ তৈরি করছেন। উৎপাদিত পলিথিনে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কও নেই। এসব কারণে পলিথিন উৎপাদন পুরাপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।’
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পলিথিন বন্ধ করা একটা দুরূহ কাজ। ২০০২ সালে কাঁচামাল আমদানিসহ পলিথিন নিষিদ্ধ করায় কিছুটা কমে আসছিল। পরে চোরাই পথে কাঁচামাল আসতে থাকে। ২০০৮ সালে গার্মেন্টের প্যাকাজিংয়ের জন্য পলিথিনের কাঁচামাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। এ সুযোগের অপব্যবহার করে ক্ষতিকর পলিথিন উৎপাদন করে আসছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
ক্যাপসের চেয়ারম্যান ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যাগ পরিবেশের জন্য যে বড় সমস্যা, তা নিয়ে আলোচনা নেই। মানুষ কেন ব্যবহার করছে, তা নিয়ে গবেষণা নেই। পলিথিন বন্ধে সরকার ক্যামেরা ট্রায়াল ছাড়া বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারের ভেতরে গবেষণাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কম—এসব কারণে পলিথিনের সমস্যা উল্টো বেড়ে চলেছে। ক্যামেরা ট্রায়াল বাদ দিয়ে গবেষণাধর্মী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহারের চিত্র : পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, সারা দেশে ৬০০ পলিথিন ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে। বেশির ভাগ কারখানা ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এসব কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ পলিথিনের ব্যাগ তৈরি হয়। মূলত এখান থেকে সারা দেশে পলিথিনের ব্যাগ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার লালবাগ, চকবাজার, কামরাঙ্গীর চর, ইসলামবাগ, ইমামগঞ্জ এলাকায় দুই শতাধিক পলিথিন ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে। চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজার, বাকলিয়া, বায়েজিদ, বউ বাজার, ময়দার মিল এলাকায়ও শতাধিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
মালিবাগ কাঁচাবাজারের মুদি দোকান কাজী স্টোরের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ব্যাগ নিয়ে ক্রেতারা বাজার করতে আসেন না। পরে চটের ব্যাগে দিতে চাইলে ক্রেতারা নিতে চান না। কারণ চটের ব্যাগের আলাদা দাম পড়ে। তখন তাঁরা অন্য দোকানে চলে যান। অন্যদিকে পলিথিনের ব্যাগে বাজার সহজে নেওয়া যায়। দাম লাগে না, বহনেও সুবিধা। এসব কারণে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করছেন তাঁরা।
আরেক ব্যবসায়ী মোরশেদ বলেন, ‘পলিথিন ব্যাগ আমরাও ব্যবহার করতে চাই না। কিছু দিন পর পর অভিযানের নামে সব ধরনের পলিথিন বন্ধ করে দেয়। ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়ে পড়ে। ক্রেতারা ব্যাগ নিয়ে এলে পলিথিনের ব্যবহার তিনি বন্ধ করবেন বলে জানান।