ভাতের অভাব ঘোচাতে মা হারা শিশুকন্যাকে এক বিত্তশালীর সন্তানকে দেখাশোনার কাজে পাঠান অভাবী বাবা; কিন্তু এক পর্যায়ে সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, যে ভাতের অভাব পূরণ করতে কাজে পাঠিয়েছিল শিশুকন্যাকে, সেই কন্যা ভাত খেতে না পেলেও নিয়মিত মারধর খাচ্ছে সেই বাড়িতে। গরম লোহা দিয়ে ১১ বছর বয়সী সেই শিশুকে দেওয়া হতো ছ্যাঁকা। অত্যাচারে তার বুক, পিঠ, ঊরু ও মুখ হয়েছে ক্ষতবিক্ষত। বর্বর এই নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথিসহ তাদের বাড়ির আরও দুই গৃহকর্মী।
গত রোববার মধ্যরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা পশ্চিম থানা-পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। এর পরদিন সোমবার তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মোহাম্মদ রফিক আহম্মেদ বলেন, ‘ঘটনার পর ভুক্তভোগীর বাবা থানায় মামলা করেন। মামলায় দুজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও দুজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়। মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্ত চারজনকেই গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও হাসপাতাল পরিদর্শন করে ভুক্তভোগীর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিচ্ছেন।’
পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় আট মাস আগে উত্তরায় সাফিকুর রহমানের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে পাঠানো হয় ভুক্তভোগী শিশু মোহনাকে। বাবাকে ব্যবসা করার জন্য দেড় লাখ টাকা ও মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার প্রলোভনে মোহনাকে নিজের বাচ্চা দেখাশোনার কাজে নিয়োগ দেন বিমান বাংলাদেশের এমডির স্ত্রী বীথি।
মোহনার বাবা মো. মোস্তফা কালবেলাকে বলেন, ‘গত দেড় মাসে আমার মেয়ের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি আমি যখন মেয়েকে নিতে এসেছি, তখন মেয়েকে দেখে আমি চিনতে পারিনি। ছেনি গরম করে আমার মেয়েকে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়েছে। আমার মেয়েকে যখন আমার হাতে তুলে দেওয়া হবে, তার আগে বীথি ম্যাডাম সাদা কাগজে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেছেন। তখনই বিষয়টি আমার কাছে খটকা লেগেছে। যখন মেয়েকে দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম এ অবস্থা কেন? তখন ম্যাডাম আমাকে বলেছে, মোহনা নাকি বাথরুমে পড়ে গিয়েছিল। তাই এ অবস্থা হয়েছে। এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রথম পাঁচ মাস পর মেয়ের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়। এর পরের তিন মাস মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। স্থানীয় এক নিরাপত্তা কর্মীর মাধ্যমে মোহনাকে কাজে নেন বীথি। সেই নিরাপত্তা কর্মী বলেন, ‘আমিই তাকে এখানে কাজে এনে দিয়েছিলাম। কাজে আনার পরে তাকে এভাবে নির্যাতন করা হবে, ভাবিনি। নির্যাতনের ক্ষত দেখে আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে পাঠাই। সেখানে আমাদের সাধ্যমতো তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
মোহনাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহনা বলে, ‘আমাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। সামান্য ভুল হলেই মারধর করত। অনেক সময় বাথরুমে আটকে রাখত। পরিবারের সঙ্গেও কথা বলতে দিত না।’ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, মোহনার বুক, পিঠ, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর ও পোড়া ক্ষতের চিহ্ন স্পষ্ট। কিছু ক্ষত শুকিয়ে শক্ত হয়ে টান ধরেছে, আবার অনেক ক্ষত এখনো দগদগে অবস্থায় রয়েছে। হাসপাতালের এক দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক বলেন, ‘শিশুটির শরীরে দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতনের স্পষ্ট আলামত রয়েছে। একাধিক পোড়া ক্ষত, গভীর আঘাত ও সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। এটি দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত নির্যাতনের ফল ‘ চিকিৎসকদের মতে, মোহনা শুধু শারীরিকভাবে নয়, চরম মানসিক ট্রমায় ভুগছে। সে বারবার আঁতকে ওঠে, কথা বলতে ভয় পায়, অচেনা কাউকে দেখলে কাঁপতে থাকে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার সাজ্জাদ আলী ভুক্তভোগী শিশুটির চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।