বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশ জারির পর সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে’ সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পালন করবেন।
গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন এক স্মারকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার জন্য গত রবিবার রাতে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি স্থাপন করা হয়েছে।
অধ্যাদেশের ধারা ৪-এ বলা হয়েছে, সংবিধানের ২২, ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নামে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় থাকবে। ধারার সাতটি উপধারায় বলা হয়েছে, সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রধান বিচারপতির হাতে। সচিবালয়ের প্রধান হবেন সচিব, যিনি সরকারের সিনিয়র সচিবের মর্যাদার সমান মর্যাদা ভোগ করবেন।
সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন।
অধ্যাদেশ জারির পরপরই সোমবার রেজিস্ট্রার জেনারেলকে সচিবালয়ের সচিব হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্মারকে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু করতে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।
জরুরি ভিত্তিতে সচিবালয় স্থাপনের দাবি : এদিকে বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বিবৃতি দিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশ জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অন্যতম বন্দোবস্ত এবং দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হবে। সংগঠনটি অন্তর্বর্তী সরকারকে সচিবালয় কার্যক্রম দ্রুত চালুর জন্য আহবান জানিয়েছে।
দ্বৈত শাসনের অবসান : অধ্যাদেশ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার বাদী ও সাবেক বিচারক মাজদার হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
সাবেক বিচারক মাজদার হোসেন বলেন, ‘এটি শুধু বিচার বিভাগের নয়, সারা দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছে। অধ্যাদেশ জারির জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান বিচারপতিকে ধন্যবাদ।
’
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এটি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন বিচার বিভাগের দায়িত্ব-দায়িত্ববোধ বেড়ে যাবে। স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পর আমরা আশা করি, বিচারকরা শুধু সংবিধান ও আইনের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘এই অধ্যাদেশের ফলে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটবে। বিচার বিভাগের ক্ষমতায়ন হয়েছে, তবে কার্যকারিতা সঠিক বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।’
আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক পদক্ষেপ। অধস্তন বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধান্ত এখন উচ্চ আদালতের নিয়ন্ত্রণে আসছে।’
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ২৭ অক্টোবর একটি খসড়া অধ্যাদেশ সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রস্তাব আকারে পাঠান। প্রস্তাবের সঙ্গে সচিবালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যপ্রণালি বিধি ও কার্যবণ্টনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ অধ্যাদেশটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত রায়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। তিন মাস পূর্ণ হওয়ার আগের দিন, রবিবার অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে।