সে এক স্কুল বটে! অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ঘর বা ভবন নয়। এই স্কুল দিব্যি নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ায়। গড়পড়তা শিক্ষার্থীরা যেখানে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করে, সেখানে এই বিদ্যালয় গ্রাম থেকে গ্রামে গিয়ে শিক্ষার্থীদেরই উল্টো তুলে নেয় নৌকায়, এরপর চলে পাঠদান।
ব্যতিক্রমী এই স্কুলের উদ্যোক্তা বাংলাদেশের স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান এবার পেয়েছেন তাঁর এই অসামান্য ব্যতিক্রমী অবদানের বৈশ্বিক স্বীকৃতি।ইউনেসকোর মর্যাদাপূর্ণ কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ পেয়েছে সৌরবিদ্যুত্চালিত তাঁর ভাসমান স্কুলের উদ্যোগ। শিক্ষায় নতুন উদ্ভাবন এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রসারে এটি বিশ্বের অন্যতম সম্মান, যা চীনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেওয়া হয়।গতকাল শুক্রবার সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
বিশ্বজুড়ে শত শত মনোনয়নের মধ্যে ইউনেসকো তিনটি উদ্যোগকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচন করেছে—বাংলাদেশের সিধুলাই ভাসমান স্কুল, আয়ারল্যান্ডের
লার্ন উইথ নালা ই-লার্নিং এবং মরক্কোর সেকেন্ড চান্স স্কুল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ এডুকেশন প্রোগ্রাম।সম্প্রতি চীনের শানডং প্রদেশের চুফু শহরে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রেজোয়ানের হাতে ট্রফি ও সনদ তুলে দেওয়া হয়।রেজোয়ান তাঁর প্রতিষ্ঠান সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার পক্ষে ট্রফি ও সনদ গ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি চলনবিল এলাকায় বড় হয়েছেন, যেখানে প্রতিবছর বন্যায় স্কুল বন্ধ হয়ে যেত। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ২০০২ সালে তিনি উদ্ভাবন করেন এক অনন্য সমাধান।স্থানীয় নৌকাকে স্কুলে রূপান্তর করেন, যা বিশ্বের সর্বপ্রথম ভাসমান স্কুল হিসেবে পরিচিত। আজও এসব সৌরবিদ্যুৎ চালিত নৌকা স্কুল, লাইব্রেরি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, যা বর্ষায় পানিবেষ্টিত গ্রামগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে।ইউনেসকো এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছে, ‘বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থানীয়ভাবে তৈরি উদ্ভাবনী উপায়ে সাক্ষরতা পৌঁছে দেওয়াই এই ভাসমান স্কুলের সাফল্য।’
সিধুলাইয়ের ভাসমান স্কুলের মডেল এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন এনজিও অনুসরণ করছে এবং এটি এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশকে একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনুপ্রাণিত করেছে। বাংলাদেশ সরকার রেজোয়ানের ভাসমান স্কুলকে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০৫০-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।এক প্রতিক্রিয়ায় মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, ‘শিক্ষা শুধু পড়ালেখা নয়, এটি শান্তি, সমতা ও সহনশীলতা গড়ে তোলে। আশা করি, সাক্ষরতা ও জ্ঞানের শক্তি দিয়ে আমাদের তরুণরা এমন এক ভবিষ্যৎ তৈরি করবে, যেখানে কোনো দুর্যোগই কোনো শিশুর শিক্ষাকে থামাতে পারবে না।’