শুরুটা যেমন ছিল
২০১৪ সালে রাজশাহী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পান সাদিয়া। ভর্তি হন নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজে। ২০১৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অসুস্থ থাকায় অল্পের জন্য এ প্লাস মিস হয়ে যায়। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে।সাদিয়া বলেন, ‘সবার কাছেই শুনেছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ দেশসেরা। তাই সিদ্ধান্ত নিই এখানেই পড়ব। ভর্তি হয়ে বাসায় ফিরে যেদিন আব্বুকে বললাম, সেদিন তিনি বলেছিলেন—তুই এমনভাবে পড়বি যেন একদিন জজ হতে পারিস। সে কথাটাই আমার অনুপ্রেরণা।
ব্যর্থতা থেকে শেখা
১৫তম বিজেএসের পরীক্ষার মাধ্যমে সাদিয়ার বিজেএস যাত্রা শুরু। অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষার পর পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য হাতে ছিল মাত্র দুই মাস সময়।কিভাবে প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা শুরু করবেন, তা তখনো জানতেন না। স্রেফ অভিজ্ঞতার জন্য প্রথমবার সেই পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। তাই প্রত্যাশামতো ফল হয়নি, প্রিলিতেই ফেল করে বসলেন। এরপর মাস্টার্স পড়াকালে ১৬তম বিজেএসে অংশ নেন। হঠাৎ বিজ্ঞপ্তি, এর ৩৬ দিন পরই প্রিলিমিনারি পরীক্ষা।কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে এক সিনিয়র আপুর পরামর্শ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। হঠাৎ তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় একদিকে মায়ের সেবা, অন্যদিকে পড়াশোনা। দুদিক সামলাতে না পেরে সেই পরীক্ষায়ও ব্যর্থ হন। ফেল করার পর খুব হতাশ হয়ে পড়লেও হাল ছাড়েননি।
নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি
মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে ২০২৩ সালের অক্টোবরে নতুন করে পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করেন সাদিয়া। এবার তাঁর লক্ষ্য একটাই, ১৭তম বিজেএসে প্রিলিমিনারি পাস করতেই হবে। প্রতিদিন টার্গেট ঠিক করতেন কতটুকু পড়বেন, পড়া শেষ না করে ঘুমাতেন না। সময় নির্ধারিত ছিল না, তবে প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা পড়া হতো। এভাবে মনোযোগ আর ধারাবাহিকতার ফলেই ১৭তম বিজেএসে প্রিলিতে পাস করেন তিনি। আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
লিখিত ও ভাইভা প্রস্তুতি
লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিংয়ে ভর্তি হন সাদিয়া। সেখানে নিয়মিত পরীক্ষা দিতেন। খাতায় লিখে অনুশীলন করতেন। ভুলত্রুটি বা কোনো অংশে দুর্বলতা থাকলে কোচিং থেকে জেনে নিতেন। আইনি বিষয়গুলোর খুঁটিনাটি খুব মন দিয়ে পড়তেন। সেগুলো লিখে রাখতেন, যাতে মনে থাকে। সাধারণ অংশের জন্য বইয়ের পাশাপাশি অনলাইনের বিভিন্ন নিবন্ধ পড়তেন। এভাবে লিখিত পরীক্ষায়ও সফল হন। ভাইভার প্রস্তুতিতে তিনি পূর্ব অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেন। যাঁরা আগেরবার ভাইভা দিয়েছিলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে তিনি নিজে নিজে নমুনা ভাইভার চর্চা করতেন। তার মনে হতো, ভাইভার সময় নার্ভাস না হলে উত্তর ভালো দেওয়া কঠিন কিছু না। তাই চাপ নিতেন না। ভাইভার সাম্প্রতিক টপিক ও আইনের বেসিক বিষয়গুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিয়েছেন।
প্রেরণা ও সাফল্যের পেছনে যাঁরা
সাদিয়ার সাফল্যের পেছনে আছে পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি। তবে সাদিয়ার দুর্ভাগ্য! তাঁর বাবা জীবিত অবস্থায় মেয়ের এই অর্জন দেখে যেতে পারেননি। সাদিয়া মনে করেন, এই সাফল্যের মাধ্যমে তিনি বাবার অপূর্ণ স্বপ্নই পূরণ করতে পেরেছেন। সাদিয়া জানান, সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন তাঁর দুই বন্ধু—জেনি ও কবির। তাঁরাও এরই মধ্যে সহকারী জজ হয়েছেন। জেনি ১৬তম বিজেএস পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন। পড়াশোনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন সাদিয়ার ছায়াসঙ্গী। ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা মানসিক চাপে যখনই দুর্বলতা এসেছে, তখনই তাঁদের সহযোগিতা ও প্রেরণাই তাঁকে টেনে তুলেছে সামনে।
পরামর্শ
সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি হলো নিরলস পরিশ্রম। মেধা যতই থাকুক, পরিশ্রম ছাড়া তা অর্থহীন। পড়াশোনার জন্য যথেষ্ট সময় না দিলে সত্যিকারের সফলতা আসে না। ব্যর্থতা কখনোই শেষ নয়; বরং এটি পরবর্তী সাফল্যের প্রস্তুতি। তাই পথ কঠিন হলেও থেমে না থেকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে একদিন নিশ্চয়ই সাফল্য ধরা দেবে।