প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল সোমবার ক্ষুধা দূরীকরণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ রূপান্তরের জন্য ছয়টি সুস্পষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার কারণে ক্ষুধা হয়। তাঁর ভাষায়, ‘ক্ষুধা অভাবের কারণে হয় না। এটি আমাদের তৈরি অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার কারণে হয়…আমাদের অবশ্যই ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে।
বিশ্ব খাদ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করার সময় অধ্যাপক ইউনূস বলেন, প্রথমত, ক্ষুধা ও সংঘাতের চক্র ভাঙার জন্য যুদ্ধ বন্ধ করুন, সংলাপ শুরু করুন এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করুন। দ্বিতীয়ত, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি পূরণ করুন, জলবায়ু পদক্ষেপকে গুরুত্ব সহকারে নিন এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের স্থিতিস্থাপকতা তৈরিতে সাহায্য করুন। তৃতীয়ত, চাপ সামলানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল করতে আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক তৈরি করুন।
তিনি বলেন, ‘ক্ষুধা দূর করার জন্য আমরা কয়েক বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে না পারলেও বিশ্ব অস্ত্রের জন্য ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।আমরা কি এভাবেই অগ্রগতিকে সংজ্ঞায়িত করি?’ তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি নতুন ধরনের ব্যবসা যুক্ত করতে হবে। এটার নাম সামাজিক ব্যবসা। ব্যক্তিগত মুনাফা ছাড়া ব্যবসা, যা টেকসই ব্যবসা তৈরি করে সমস্যার সমাধান করে, সমস্যা তৈরি করে না। তিন শূন্য বিশ্ব (দারিদ্র্য দূরীকরণ, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নির্গমনের জন্য শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ) সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এটি কোনো স্বপ্ন নয়। এটি একটি প্রয়োজনীয়তা, বিশ্বকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়।’
তিনি বলেন, ‘যদি আমরা যুবসমাজে বিনিয়োগ করি, তাহলে আমরা কেবল বিশ্বকে খাওয়াব না, আমরা বিশ্বকে বদলে দেব। আসুন আমরা একসঙ্গে কাজ করি। একটি তিন শূন্য বিশ্ব গড়ে তুলি।’ প্রফেসর ইউনূস বলেন, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ৮০ বছর কেবল একটি উদযাপন নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহবান।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, এফএও সদর দপ্তরে পৌঁছলে প্রফেসর ইউনূসকে স্বাগত জানান জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক কু ডংইউ। এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা রোমে এফএও সদর দপ্তরে ব্রাজিলের কৃষিবিদ এবং লেখক হোসে গ্রাজিয়ানো দ্য সিলভার সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, রোমে আজকের কর্মসূচি অনুযায়ী অধ্যাপক ইউনূস মূল বক্তব্য দেওয়ার পর গ্লোবাল অ্যালায়েন্সের অফিস পরিদর্শন করবেন। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরির সঙ্গে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে এবং জিবুতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে বৈঠক করবেন প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর দিনশেষের কর্মসূচি অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে এফএও মহাপরিচালক ড. কু ডংইউ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
আইএফএডি প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ : রোমে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে রবিবার তাঁর হোটেলে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) প্রেসিডেন্ট আলভারো লারিও। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রধান উপদেষ্টা আইএফএডিকে বাংলাদেশের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা, নারী, কৃষক ও খাদ্য প্রক্রিয়াকারীদের সহায়তার জন্য একটি সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠনের আহবান জানিয়েছেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমি আপনাদের একটি সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠনের আহবান জানাই। এমন তহবিল যা দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, তরুণ, কৃষক, নারী ও মৎস্য খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেবে।’
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি জানান, বাংলাদেশের নারী দুগ্ধ খামারিরা মহিষের দুধ দিয়ে মোজারেলা চিজ তৈরি করছেন। তিনি এ খাত সম্প্রসারণে আইএফএডির সহায়তা চান।