আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের গুম, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৩০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল বুধবার প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারক হলেন মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। দুই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আসামির তালিকায় তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা প্রধানদের নাম রয়েছে।ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো: তাজুল ইসলাম এ দিন দুই মামলায় মোট ৩০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে তা আমলে নেয়ার এবং আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন।
টিএফআই সেলে নির্যাতনের মামলার আসামিরা হলেন-১. সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; ২. সাবেক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী; ৩. সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল; ৪. সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ; ৫. র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশিদ হোসেন; ৬. র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার মো: হারুন-অর-রশিদ; ৭. র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান; ৮. র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম; ৯. র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার; ১০. র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) কর্নেল কে এম আজাদ ১১. র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: কামরুল হাসান; ১২. র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম; ১৩. র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন; ১৪. র্যাবের সাবেক পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সারওয়ার বিন কাশেম; ১৫. র্যাবের সাবেক পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম; ১৬. র্যাবের সাবেক পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মশিউর রহমান জুয়েল; ১৭. র্যাবের সাবেক পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন।
টিএফআই সেলে বন্দী রেখে নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। আর জেআইসিতে বন্দী রেখে নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধী মতের বহু মানুষকে তুলে নিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখার অভিযোগ ওঠে, সেইসব বন্দিশালার প্রতীকী নাম রাখা হয় ‘আয়নাঘর’।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসব ‘গুমের’ ঘটনা তদন্তে গত বছর আগস্টে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে সরকার। গত ডিসেম্বরে জমা দেয়া কমিশনের প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ‘গুমের নির্দেশদাতা’ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে কমিশনের তদন্তে।
এসব ঘটনায় হাসিনা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারও সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়, যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (চাকরিচ্যুত) জিয়াউল আহসান এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা মো: মনিরুল ইসলাম ও হারুন অর রশীদ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই বিভিন্ন ‘ব্ল্যাক সাইট’ পরিচালনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত হচ্ছে ‘আয়নাঘর’, যেখানে বন্দীদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রেখে চরম নির্যাতন চালানো হতো। বিগত সরকারের আমলে ‘আয়নাঘর’ নামে কুখ্যাতি পাওয়া এরকম তিনটি গোপন বন্দিশালা গত ১২ ফেব্রুয়ারি ঘুরে দেখেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
গত ৩ জুলাই সেনা সদরের এক সংবাদ সম্মেলনে মিলিটারি অপারেশনস ডাইরেক্টরেটের স্টাফ কর্নেল মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য ডেপুটেশনে থাকেন, তারা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকেন না। ডেপুটেশনে থাকা কিছু সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে।
‘এই তদন্তে যদি গুমের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলে অবশ্যই সেনাবাহিনী তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে বাংলদেশ সেনাবাহিনী সব ধরনের সহযোগিতা করেছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা থাকবে।’ গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করার প্রস্তাবে ইতোমধ্যে সম্মতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ২৫ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। খসড়া অধ্যাদেশে গুমকে সজ্ঞায়ন ও শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গোপন আটক কেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুম সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
‘মানুষের নাড়িভুঁড়ি কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি না ফিরুক’মানুষের হাত-পা ও নাড়িভুঁড়ি কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি কখনো ফিরে আসুক; এটা বাংলাদেশের কেউ আর চায় না বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বুধবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি আরো বলেন, গত ১৫ বছর ধরে চলার সময়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য, যারা উত্তরাস্থ টিএফআই সেলসহ গোপন বন্দিশালায় ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিকসহ যারা তৎকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন; সেসব লোককে আটক রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। এমন হাজারও অভিযোগের মধ্য থেকে কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। সেসবের ব্যাপারে আমরা ফরমাল চার্জ দাখিল করেছি।
জেআইসি প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর বা ডিজিএফআইয়ের কিছু সংখ্যক বিপথগামী সদস্য, যারা জেআইসি নামক যে সেন্টারটি রয়েছে সেই সেন্টারটিকে অপব্যবহার করে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক বন্দীদের গোপন কারাগারে আটক রেখেছিল। এ নিয়ে আলাদা তদন্ত প্রতিবেদন ও ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) আমরা দাখিল করেছি। এ ঘটনার সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ র্যাব-ডিজিএফআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কিছু কর্মকর্তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছি আমরা। এর মাধ্যমে একটা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই যে, অপরাধ যারা করবেন, যারা আইনকে নিজের হাতে তুলে নেবেন, অপরাধীকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এটা ন্যায়বিচারের দাবি।