জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়নে ‘গণভোট’ প্রশ্নে একমত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভোটের সময় নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত দেশবাসী আবার গণভোট দিতে যাচ্ছে, তা অনেকটাই নিশ্চিত।
রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের পর জুলাই সনদের পক্ষে গণভোট আয়োজনের আহ্বান জানাবে সরকার। এরপর নির্বাচন কমিশন (ইসি) গণভোটের আয়োজন করবে।
এই সংকট নিরসনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কমিশন। অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তৃতীয় দফায় গত ১১, ১৪ ও ১৭ সেপ্টেম্বর এবং ৫ অক্টোবর সংলাপ করেছে কমিশন। সংলাপে গণভোটের প্রশ্নে একমত হয়েছে দলগুলো।
কমিশন সূত্র জানায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে আপত্তি ছিল বিএনপির। কিন্তু অবস্থান পরিবর্তন করছে দলটি।কারণ এই ইস্যুতে পরিস্থিতি জটিল ও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হোক, তা চায় না বিএনপি। দলটি আগামী সংসদ নির্বাচনের দিন এই গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছে। এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশির ভাগ দল। তবে সংসদ নির্বাচনের দুই মাস আগে গণভোটের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া গণভোটের প্রক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। এটি শেষ পর্যন্ত দূর হবে বলে আশাবাদী ঐকমত্য কমিশন।
এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘গণভোট’ প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। এটি সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রথম পদক্ষেপ। তিনি বলেন, আমরা খুব শিগগির সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুপারিশ তৈরি করে সরকারের কাছে দিতে পারব বলে মনে করি। এরপর সরকার গণভোটের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর গণভোটের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরির জন্য অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করবে। এরপর গণভোট আয়োজনের আইনি কাঠামো তৈরি করবে। ইভিএম বা কাগজের ব্যালট—যেটা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ বলে মনে হয়, সেটি ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক থাকবে। গণভোট কমিশন স্বচ্ছভাবে ফলাফল ঘোষণা করবে। ফলাফল প্রকাশের পর তা চূড়ান্ত ও জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বলে গৃহীত হবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, এ পর্যন্ত দেশে বহুল আলোচিত তিনটি গণভোটের মধ্যে প্রথমটি হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে। এখানে প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত সব নীতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আপনি একমত কি না? জনগণের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় ছিল। একই কাজ করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সেই গণভোটেও ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছিল। এরপর ১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর গঠিত সংসদে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চালুর সিদ্ধান্ত হলে ওই বছর সংবিধানে ১২তম সংশোধনী এনে তা গণভোটে পাঠানো হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাস করায় সংসদীয় পদ্ধতি বা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়।
একইভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে ভোট হলে ‘হ্যাঁ’ পাস করবে বলে আশাবাদী সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদে সত্যিকারের জনসমর্থন আছে কি না, গণভোট তা নিশ্চিত করবে। দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করছি, অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি, জনগণ তার পক্ষে আছে কি না, গণভোটের রায় হবে তার চূড়ান্ত অভিমত।
গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে জনরায় আসবে বলে আশাবাদী জামায়াতে ইসলামীর নেতা সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সনদটি স্বাক্ষরের পর তা জনসাধারণের কাছে চলে যাবে, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হবে, ওয়েবসাইটে যাবে, সবাই সেটা পড়তে পারবে। তার আলোকে জনগণের মতামত চাওয়া হবে যে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলুন। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের দিন সাধারণ ভোটের পাশাপাশি গণভোটের জন্য আলাদা ব্যালট থাকবে। যেখানে সনদের আইনি ভিত্তির বিষয়ে জনগণ মতামত দেবে। এ বিষয়ে অধিকাংশ দল একমত হয়েছে। সনদ বাস্তবায়নে জনগণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবে।
রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয় এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করে কমিশন।
ছয় মাস মেয়াদের কমিশন ১৫ আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় মেয়াদ ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এর পরও দ্বিতীয় দফায় কমিশনের মেয়াদ আরো এক মাস বাড়িয়ে ১৫ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। সব প্রক্রিয়া শেষ করে ১৫ অক্টোবরের জুলাই সনদ স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী ঐকমত্য কমিশন।