সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রণোদনা কিস্তি হিসেবে এক হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে। দেশের রপ্তানি খাতকে আরো বহুমুখী করতে এই প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার।
এবার শুধু তৈরি পোশাক খাতই নয়, বরং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালাল মাংস, হালকা প্রকৌশল এবং বহুমুখী পাটজাত পণ্যের মতো অপ্রচলিত খাত সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা পাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রণোদনার মূল লক্ষ্য রপ্তানির ক্ষেত্রকে বহুমুখী করা এবং তৈরি পোশাক খাতের ওপর থেকে নির্ভরতা কমানো।
অর্থ বিভাগ থেকে সম্প্রতি জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের অধীনে ‘ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যবস্থাপনা (সাধারণ রপ্তানি প্রণোদনা)’ খাত থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে এই অর্থ ছাড় করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই অর্থের মাধ্যমে দেশীয় শিল্প, হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ, চামড়াজাত দ্রব্যসহ অনুমোদিত অন্যান্য রপ্তানি খাতে নগদ সহায়তা এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে ১ শতাংশ বিশেষ নগদ সহায়তা প্রদান করবে।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৪৩টি রপ্তানিমুখী খাতকে এই নগদ সহায়তা দেওয়া হবে, যার হার ০.৩০ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে। এই তালিকায় রপ্তানিভিত্তিক নতুন ও সম্ভাবনাময় খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সবজি, ফলমূল, হালাল মাংস, ব্যাটারি এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের মতো খাত এবার সর্বোচ্চ প্রণোদনা পাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা শুধু প্রণোদনা নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা। সরকার দেখাতে চাচ্ছে, তারা রপ্তানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করতে চায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ইস্যুতে চামড়া খাতের সম্ভাবনা বাড়লেও সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কেননা সাভার হেমায়েতপুরের অনেক ট্যানারি এখনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।’ এ ছাড়া সরকার প্রণোদনা দিলেও এসব প্রণোদনা কোথায় যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে মত দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘প্রণোদনার টাকা নিয়ে নয়ছয় হওয়ার সুযোগ খুবই কম। কেনন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রপ্তানির টাকা নিশ্চিত না করে (এক্সপোর্ট প্রসিডস) প্রণোদনা দেয় না।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকার প্রকৃত রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা দেয়। এ ছাড়া দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি, পণ্য বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজারের সন্ধান উৎসাহিত করতে এই প্রণোদনা দেওয়া হয়।
বগুড়ার একটি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকারী কম্পানির কর্ণধার রওশন আরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ। এত দিন আমরা পেছনের সারিতে ছিলাম, এবার সমান সুযোগ পাচ্ছি। তবে ব্যাংকিং জটিলতা না কমলে অনেকেই উপকৃত হতে পারবে না।’
ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর নির্দেশনা : অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, এই তহবিল শুধু প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে রপ্তানিকারকদের মধ্যে বিতরণ করা যাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো কোনোভাবেই এই অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করতে পারবে না। অন্যথায়, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
প্রণোদনা এখন শুধু ভর্তুকি নয়, কৌশল : চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য সরকার মোট ৮৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। তবে এবার যে কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে তা হলো, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশে সহায়তা দেওয়া।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রণোদনা ছাড়ে সরকার আগের চেয়ে অনেক দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে। সরকার গুণগতমানে পরিবর্তন আনতে চায়। আর কৌশলগত রপ্তানিনীতির ফলে একক পণ্য নির্ভরতা থেকে বের হয়ে অন্য খাতগুলো এগিয়ে আসতে সহায়তা দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এটা সরকারের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ।