কারবালার শোক ও ত্যাগের মহিমান্বিত আদর্শ বুকে ধারণ করে রাজধানীতে শেষ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল।
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেল ৩টায় রাজধানীর জিগাতলা সংলগ্ন ধানমন্ডি লেকের প্রতীকী কারবালা প্রাঙ্গণে বিশেষ মোনাজাত, মাতম ও দোয়ার মাধ্যমে দিনব্যাপী এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাসের ১০ তারিখ তথা পবিত্র আশুরার দিনটি বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। কারবালার স্মৃতি স্মরণে প্রতি বছরের মতো এবারও রাজধানী ঢাকা সেজেছিল শোকের আবহে।
শুক্রবার সকাল থেকেই পুরান ঢাকার হোসাইনী দালান প্রাঙ্গণে সমবেত হতে থাকেন সাধারণ মানুষ। সকাল ১০টায় সেখান থেকে মূল তাজিয়া মিছিলটি বের হয়। মিছিলে অংশ নেওয়াদের পরনে ছিল শোকের প্রতীক কালো পোশাক। শূন্য পায়ে হেঁটে তারা বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন।
মিছিলটি হোসাইনী দালান থেকে বের হয়ে চকবাজার, লালবাগ, আজিমপুর, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় হয়ে জিগাতলা ও ধানমন্ডি লেক অভিমুখে অগ্রসর হয়। দীর্ঘ পথজুড়ে মাতমকারীদের ক্লান্তি দূর করতে রাস্তার দুই পাশে স্বেচ্ছাসেবকদের পানি ও শরবত বিতরণ করতে দেখা যায়।
শত বছরের ঐতিহ্য মেনে মিছিলের সামনের কাতারে রাখা হয় ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত দুটি প্রতীকী ঘোড়া, যার মধ্যে দ্বিতীয় ঘোড়াটি ছিল রক্তের লালে রাঙানো যা কারবালার নির্মম প্রান্তরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিবি ফাতেমা (রা.) এর স্মরণে মিছিলের সম্মুখভাগে বহন করা হয় দুটি কালো গম্বুজ। এছাড়া কালো কাপড়ে মোড়ানো ইমাম হোসেন (রা.) এর প্রতীকী মরদেহ (তাবুত) ও কফিন বহন করেন শোকসন্তপ্ত ভক্তরা। মিছিলে পায়ে ঘণ্টা পরা তরুণদের দল এবং কারবালার শোকগাথা নিয়ে শোকগীতি পাঠকদের উপস্থিতি মিছিলের আবহকে আরো গম্ভীর করে তোলে।
মিছিল চলাকালে কারবালার সেই মর্মান্তিক স্মৃতি স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেক ভক্ত। মিছিলে অংশ নেওয়া শিয়া সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আজগর আলী অশ্রুসজল চোখে বলেন, “কারবালার এই শোক কেবল শত শত বছর আগের কোনো ইতিহাস নয়, এটি আমাদের হৃদয়ের গভীরে থাকা এক চিরন্তন ক্ষত। ফোরাত নদীর তীরে ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর নিষ্পাপ পরিবার যেভাবে সত্য আর ন্যায়ের জন্য নিজেদের রক্ত বিলিয়ে দিয়েছেন, তা মনে করলে আজও বুক ফেটে কান্না আসে। আমরা এই শোক বুকে নিয়েই বেঁচে আছি।”
বড় বাঁশে ভারী নিশান কাঁধে নিয়ে হাঁটতে থাকা তরুণ রাকিব হাসান সুজন আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, “নিশানটা বহন করতে শরীর ও কাঁধে একটু কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ইমাম হোসেন (রা.) এবং কারবালার শহীদরা যে কষ্ট ও কোরবানি দিয়ে গেছেন, তার তুলনায় আমাদের এই কষ্ট কিছুই না। এই কষ্টটার মাঝেই এক পরম আত্মতৃপ্তি আর ভালো লাগা কাজ করছে।”
মিছিলে অংশ নেওয়া সৈয়দা ফাতেমা রেজোওয়ানা বলেন, “বিবি ফাতেমার সন্তানদের ওপর কারবালার ময়দানে যে নির্মম অত্যাচার করা হয়েছিল, একজন মা হিসেবে সেই শোক সহ্য করা কঠিন। প্রতি বছর এই দিনটি এলে বুকটা ভেঙে যায়। আমরা এখানে এসেছি ইমামের পরিবারের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আর শোক প্রকাশ করতে।”