স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগী ছিল আট হাজার ৩৬৭ জন। মৃত্যু হয় ৬০ জনের। ১৮ থেকে ২৪ মে হাসপাতালে আসে আট হাজার ৯০১ জন।
সর্বশেষ গতকাল রবিবার হামের উপসর্গে আগের ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৬ শিশু মারা গেছে। এই সময়ে সারা দেশে হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৪৩৪ জন। এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু ৫২৮ শিশুর।
গত এক দিনে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গে ঢাকায় ১০, রাজশাহীতে এক, সিলেটে এক, বরিশালে এক, ময়মনসিংহে দুই ও রংপুরে একজন মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪৪২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে, আর হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৮৬ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬৩ হাজার ৮১৩ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৮ শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাঁদের মতে, সময়মতো ব্যাপক টিকাদান, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নির্দেশিকা, অক্সিজেনসহ জরুরি সেবা নিশ্চিত করা গেলে এত মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল।
এর আগে গত আড়াই দশকে দেশে কখনো হামের রোগীর সংখ্যা ২৬ হাজার ছাড়ায়নি। এর আগে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে, তখন আক্রান্ত ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর টিকাদান কর্মসূচির কারণে সংক্রমণ অনেক কমে আসে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এর আগের পাঁচ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় দেশে হামের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৭ সালে দেশে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু হলেও তাদের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালে বান্দরবানে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তবে এবারের মতো এত ব্যাপক মৃত্যু ও সংক্রমণের নজির আগে দেখা যায়নি।
গত শুক্রবার জাতিসংঘ বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ মে পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় ৫৭ হাজার ৮৫৬ জন সন্দেহভাজন এবং আট হাজার ৬৭ জন নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৮১ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল থেকে প্রতি সপ্তাহেই সংক্রমণ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং দৈনিক গড় আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। যদিও সাম্প্রতিক টিকাদান কর্মসূচির পর কিছু উপজেলায় সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে।
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্যাম্পগুলোতে ৫৯৫ জন সন্দেহভাজন এবং ৬০ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। সেখানে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের ৬৩ শতাংশের বয়সই পাঁচ বছরের কম। এর মধ্যে ২০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে, যারা নিয়মিত এমআর টিকার আওতায় ছিল না।
কেন বাড়ছে মৃত্যু : প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তাদের বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। মায়েদের পুষ্টিহীনতাও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে হাম ও এর জটিলতা মারাত্মক আকার নিচ্ছে।
তিনি জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন হামের টিকার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। যেসব শিশু আগে দুই ডোজ টিকা পেয়েছে, তাদেরও ক্যাম্পেইনের আওতায় টিকা নিতে আহবান জানানো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সরকারের পদক্ষেপগুলো দেরিতে এসেছে। হামে আক্রান্ত শিশুকে আইসিইউ পর্যন্ত যেতে না দেওয়াই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ, অক্সিজেন থেরাপি এবং কমিউনিটি পর্যায়ে আইসোলেশন নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, এখনো হামের জন্য সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রটোকল প্রকাশ করা হয়নি। ফলে উপজেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে বেসরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত চিকিৎসকরা সমন্বিত নির্দেশনা পাচ্ছেন না।