দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে আরো ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১০ জেলা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর (শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়ক যন্ত্র) যুক্ত হচ্ছে।
দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে আরো ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১০ জেলা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর (শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়ক যন্ত্র) যুক্ত হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ১০ জেলা হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর এবং পাঁচটি করে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর হস্তান্তরকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এসব তথ্য জানান।
১০ শয্যার আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালগুলো হলো টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও যশোরের ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল; মাদারীপুর, বাগেরহাট ও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল; মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল এবং শেরপুর জেলা হাসপাতাল।
দেশজুড়ে হামের নজিরবিহীন প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অনেক জেলায় সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এতে পথে অনেক শিশুর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪২ জেলার ৭৪টি সরকারি হাসপাতালে মোট এক হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। অর্থাৎ এখনো ২২ জেলায় কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই। মোট আইসিইউ শয্যার ৭৫৮টিই ঢাকার ২২টি হাসপাতালে কেন্দ্রীভূত। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া ও মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্পের আওতায় ২২ জেলায় ২৪০ শয্যার আইসিইউ স্থাপন করা হয়। যদিও এসব আইসিইউতে এত দিন পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর সুবিধা ছিল না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকার বাইরে ১৩ জেলা সদর হাসপাতালের আইসিইউ কেন্দ্রে পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর এবং পাঁচটি করে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর দেওয়া হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যেই এসব হাসপাতালে সেবা চালু হবে, যাতে শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে মারা না যায়। ঈদের এক সপ্তাহ পর আমরা পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর উদ্বোধন করব। এতে ঢাকার ওপর চাপ কমবে।’
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীদের নিরাপত্তায় দেশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম বা ‘পাগলা ঘণ্টা’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। তিনি বলেন, যদি কোনো চিকিৎসক বা রোগী হামলার শিকার হন, তাহলে ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম বাজানো যাবে। তখন হাসপাতালে অবস্থানরত চিকিৎসক ও অন্যরা সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসবে।
এ ছাড়া মহাখালী এলাকায় বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য সংস্থা ও হাসপাতাল থাকায় সেখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক ও হাসপাতাল প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এসব উদ্যোগ নিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি : হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরো ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। আর দুই শিশুর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭৫। এর মধ্যে ৭৭ জনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া ১১ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে তিনজন, সিলেটে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে দুজন মারা গেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছে।
চিকিৎসায় বিশেষ নির্দেশনা : দেশজুড়ে হাম রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সরকারি ও বেসরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আলাদা ওয়ার্ড বা কেবিন নির্ধারণসহ সরকারি হাসপাতালের জন্য পাঁচ দফা এবং বেসরকারি হাসপাতালের জন্য ছয় দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা জারি করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কেবিন চালু করতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন অনুযায়ী, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০ শতাংশ শয্যা বিনা মূল্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা। এর মধ্যে ৫ শতাংশ শয্যা হাম রোগীদের জন্য নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের জন্য নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করতে হবে। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রাউন্ড দিতে হবে। রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি অভিভাবক বা দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবে না। পাশাপাশি ভর্তি রোগীদের তথ্য প্রতিদিন এমআইএস সার্ভারে আপলোড করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামে হাসপাতালে রোগী কমেনি : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে চট্টগ্রাম নগরে গত সোমবার পর্যন্ত মোট লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি (অর্থাৎ ১০৩ শতাংশ) শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদানের মাসব্যাপী কর্মসূচি আজ বুধবার শেষ হচ্ছে। একইভাবে চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় টিকাদানের হার ১০০.৩৫ শতাংশ। এই হিসাবে চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত মোট লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরও হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি কমছে না।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল নগর ও জেলা নিয়ে নতুন করে ৪৬ জন ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ জনই নগরের হাসপাতালগুলোতে। একই দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোট রোগী (নগর ও জেলা) ২৬৮ জন। এর মধ্যে নগরের হাসপাতালে ভর্তি আছে ২৬৩ জন। অন্য পাঁচজন জেলার বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। তার আগের দিন গত সোমবার ভর্তি হয়েছিল ৪৩ জন। ওই দিন বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ভর্তি ছিল ২৪৭ জন। এই হিসাবে গত দুই দিনে ভর্তি ও চিকিৎসাধীন রোগী বেড়েছে।