বাসায় ঢুকেই দেখেন, শয়নকক্ষে ছোট বোন, ভাই ও তিন ভাগ্নিসহ পাঁচজনের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। ওই দৃশ্য দেখে ফাতেমা ‘ও ভাইরে, ও বোন রে, ও মারে’ বলেই জ্ঞান হারান।
পাঁচ খুনের খবর পেয়ে কাপাসিয়া থানার পুলিশ, র্যাব, সিআইডি, পিবিআইসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চাপাতি, ঘুমের ওষুধ, মদ ও কোকের বোতলসহ বেশ কিছু আলমত জব্দ করেছে। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ফোরকান তাঁর ভাই মিশকাতের কাছে ফোন করে স্ত্রী, শ্যালক, বড় দুই মেয়ে ও ছোট মেয়েকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে শুনেছেন।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে থানায় নেওয়া হয়েছে। তবে খুঁজে পাওয়া যায়নি ফোরকান মোল্লাকে।
নিহত শারমিনের বড় বোন ফাতেমা বেগম কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি স্বামী-সন্তান নিয়ে গাজীপুর মহানগরীর পোড়াবাড়ী মাস্টারবাড়ী এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে স্থানীয় গার্মেন্টসে কাজ করেন। তাঁর স্বামীও গার্মেন্টস শ্রমিক। ছোট ভাই রসুল মোল্লাও তাঁর বাসায় থেকে অন্য একটি কারখানায় কাজ করতেন। গত শুক্রবার বিকেল থেকে কয়েক দফা ফোন করে তাঁর ছোট ভাইকে চায়না প্যাকেজিং কারখানায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে বাসায় ডেকে নেন ফোরকান। তিনি জানান, এক বছর আগে সর্বশেষ বোন শারমিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। শারমিনের মোবাইল ফোন ছিল না। ফোরকানের মোবাইল ফোন দিয়ে কথা বলতে হতো। গত বুধবার শেষ কথা হয় ফোরকানের মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই। কথাবার্তায় মনে হয়নি তাঁদের মধ্যে কোনো অশান্তি বা ঝামেলা চলছিল। আর থাকলেও হয়তো বলতে পারেননি। কারণ কথা বলার সময় ফোরকান সব সময় পাশে থাকতেন।
নিহত শারমিনের ভাই শাহীন মোল্লা বলেন, ফোরকান পরকীয়ায় জড়িয়েছিলেন। স্ত্রী-সন্তান ও তাঁর ভাই তাতে বাধা দিতেন। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ফোরকান খুনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন।
পুলিশ জানায়, বাসার প্রথম কক্ষের খাটে ফোরকানের শ্যালক, মেঝেতে পাশাপাশি তিন মেয়ের এবং পাশের কক্ষে জানালার গ্রিলে নতুন নাইলনের দড়ি দিয়ে শক্ত করে দুই হাত বাঁধা অবস্থায় ঝোলানো ছিল স্ত্রী শারমিনের রক্তাক্ত লাশ। শারমিনের পরনে নতুন শাড়ি-ব্লাউজ এবং শরীরে গয়না ছিল। তাঁর চোখ-নাক স্কচ টেপ দিয়ে শক্ত করে মোড়ানো এবং মুখে কাপড় গোঁজা ছিল। ঘরের সব জিনিসপত্র এলোমেলো ছিল। শিশু ফারিয়া ছাড়া প্রত্যেকের শরীরে এলোপাতাড়ি অনেক কোপের দাগ ছিল। প্রতিটি লাশের পাশে টঙ্গী, গোপালগঞ্জ সদর ও কাপাসিয়া থানার ওসির কাছে টাইপ করা কয়েকটি অভিযোগপত্র পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগপত্রে ফোরকান স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়া এবং শ্বশুরের বিরুদ্ধে কয়েক দফায় ১০ লাখ টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ করেন। এ ছাড়া উল্লেখ করেন, টাকা ফেরত চাইলে তাঁদের সঙ্গে মনোমালিন্য হতো এবং তাঁকে আটকিয়ে শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন, এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। তবে এসব অভিযোগপত্রে থানার কোনো সিল নেই।
লাশের সুরতহাল তৈরিকারী কাপাসিয়া থানার এসআই মো. রিগ্যান জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি চাপাতি, ঘুমের ওষুধ ও ওষুধের খালি পাতা, মদ ও কোকের বোতলসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। ফোরকানের ভাড়া বাসার রান্নাঘরে রান্না করা পায়েস, আলাদা পাতিলে রান্না করা গরুর ও মুরগির মাংস পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, খাবার খাওয়ানোর পর কোক বা পায়েসে ঘুমের ওষুধ দিয়ে এবং তা খাইয়ে অচেতন করে স্ত্রী, শ্যালক ও বড় দুই মেয়েকে কুপিয়ে এবং ছোট মেয়েকে গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়েছেন ফোরকান। হত্যাকাণ্ডের আগে তিনি মদ পান করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাড়ির পাশের দোকানি সুরমা বেগম বলেন, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ফোরকান ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে চিপস কিনেছিলেন। দোকানে কিশমিশ আছে কি না তা-ও জানতে চেয়েছিলেন।
বাড়ির মালিকের স্ত্রী লুত্ফুন নেছা জানান, গত জানুয়ারিতে ফোরকান বাসা ভাড়া নেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কখনো ঝগড়াঝাঁটি হতে দেখেননি। মেয়ে, ছেলে ও নাতনিদের লাশ দেখে কান্না-জড়ানো কণ্ঠে শাহাদাৎ মোল্লা বলেন, ‘আমি ঘাতকের ফাঁসি চাই।’
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন জানান, জব্দ আলামতগুলো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান শুরু করেছে। তা ছাড়া দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দ্রুত এই ঘটনার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হবে।
গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে মাতম : গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, একদিকে ছেলে-মেয়ের নিথর দেহ, অন্যদিকে নাতনিদের নির্মম মৃত্যুর বার্তা শোনার পর দিশাহারা হয়ে পড়েছেন নিহত শারমিনের মা ফিরোজা বেগম (৬০)। জানা গেছে, ফিরোজার সাত ছেলে-মেয়ের মধ্যে শারমিন আক্তার তৃতীয় আর রসুল মোল্লা সবার ছোট। কয়েক বছর শ্বশুরবাড়ি থাকার পর দাম্পত্য কলহ শুরু হলে শারমিনকে নিয়ে প্রথমে ঢাকায় এবং ছয় মাস আগে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় যান ফোরকান। এক বছর আগে পারিবারিক কলহ হলে শারমিন বাবার বাড়িতে চলে যান। পরে ফোরকান শ্বশুরবাড়ির লোকদের বুঝিয়ে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের ফিরিয়ে নেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শারমিনের মা ফিরোজা বেগম বলেন, ‘আমার বাজান গতকাল নতুন জামা-প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাসায় গেছে। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া হবে। আমার রসুল, আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে…।’ এ কথা বলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পাশে থাকা স্বজনরা তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন; কিন্তু সন্তানের শোকে মুহূর্তেই আবার ভেঙে পড়েন এই মা।