বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

হামে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কেন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশুমৃত্যু। এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে হামে ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু ইতোমধ্যে ৩০০ ছাড়িয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে দুজন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু আগের দিন হলেও সামগ্রিক হিসাবেই মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ২৫৯ জন এবং নিশ্চিত হামে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের সময় উপসর্গসহ মৃত্যুকেও হামের মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, ফলে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৩১১ জনে।

এই প্রাদুর্ভাবের সূচনা হয় বছরের শুরুতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। শুরুতে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব না পেলেও পরে দ্রুত দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। মার্চের মাঝামাঝি রাজশাহীসহ একাধিক জেলায় সংক্রমণ বাড়তে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ইতোমধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু।

সরকার টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। এপ্রিলের শুরুতে সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম পরে সারা দেশে বিস্তৃত করা হয়। বর্তমানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও তা দেরিতে হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সময় লাগছে।

মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। লালমনিরহাট, বান্দরবানসহ বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার অভাব থাকায় রোগীদের বড় শহরে নিতে হচ্ছে, কিন্তু ততক্ষণে রোগ জটিল হয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, হামের সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো নিউমোনিয়া। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক জানিয়েছেন, হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। ফলে রোগটি জটিল হয়ে গেলে চিকিৎসা সীমিত হয়ে যায়। বিশেষ করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে শিশুর ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তখন লাইফ সাপোর্ট দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো যায় না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসনিম বলেন, অধিকাংশ শিশুকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে অনেক দেরিতে, যখন তারা ইতোমধ্যে জটিল অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এতে চিকিৎসা দিয়েও তাদের সুস্থ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। মৃত্যুসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য—যেমন রোগীর বয়স, হাসপাতালে আসতে দেরি, কী ধরনের জটিলতা ছিল—এসব তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা এবং শনাক্ত রোগীর সংখ্যার মধ্যেও বড় ফারাক রয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৪২ হাজার মানুষ হামের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এলেও নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসার কারণে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো অক্সিজেন ও আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতা। দেশে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা থাকলেও সবগুলো শিশুদের জন্য উপযোগী নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, কোভিড–১৯ সময় যে উন্নত অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তা আবার সক্রিয় করা গেলে মৃত্যুহার কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই। অনেক অভিভাবক আতঙ্কে শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে আসছেন, এতে প্রকৃত গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।

তারা ছয়টি লক্ষণ উল্লেখ করেছেন, যেগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে—শ্বাসকষ্ট, খাবার গ্রহণে অক্ষমতা, বারবার বমি, খিঁচুনি বা অচেতনতা, চোখ ও মুখে জটিলতা এবং তীব্র অপুষ্টি বা পানিশূন্যতা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত রোগ শনাক্ত, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং রোগী আলাদা করে চিকিৎসা দিলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয় ও তথ্যস্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে, টিকাদান দেরিতে শুরু হওয়া, চিকিৎসা পেতে বিলম্ব, হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা এবং সমন্বয়ের অভাব—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই বাড়ছে শিশুমৃত্যু। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা টুডে / আরজে

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com