রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এখন দৃশ্যমান গতি পেয়েছে। অর্থসংকট ও শেয়ার জটিলতায় থমকে থাকা প্রকল্পটি নতুন অর্থায়নে ফের পুরোদমে চালু হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছরের শেষ বা নতুন বছরের শুরুতেই চালু হতে পারে কুতুবখালী পর্যন্ত পুরো অংশ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে দিন-রাত কাজ করছেন প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অর্থের জোগান নিশ্চিত হওয়ায় দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে কাজ।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশের কাওলা থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালীতে গিয়ে শেষ হবে ১৯.৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে। হাতিরঝিলসংলগ্ন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) পর্যন্ত অংশ চালু হওয়ায় এরই মধ্যে এর সুফল পাচ্ছেন নগরবাসী।
এফডিসি গেট থেকে মগবাজার রেলগেট পর্যন্ত গার্ডার বসানোর কাজ শেষ।
ডিসেম্বরের মধ্যে কুতুবখালী পর্যন্ত চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।’
শেয়ার জটিলতা কাটিয়ে গতি : শেয়ার নিয়ে বিদেশি ঠিকাদারদের বিরোধে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। একই বছরের আগস্টের পর কিছুদিন ধীরগতিতে কাজ চললেও পরে পাঁচ মাস বন্ধ থাকে প্রকল্প। নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে গত বছরের জুনে পুনরায় কাজ শুরু হয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে প্রকল্পে সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের ২০ শতাংশ এবং শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপের ৮০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, যার ৭৩ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের এবং ২৭ শতাংশ সরকারের ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং (ভিজিএফ)।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পের অগ্রগতি এখন চোখে পড়ার মতো। আগে শেয়ার ও অর্থায়ন সমস্যায় কাজ ধীর ছিল, এখন চীনা ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে। কুতুবখালী পর্যন্ত চালু হলে মগবাজার, মালিবাগ, কমলাপুরসহ আশপাশের নিচের সড়কে চাপ কমবে। এরই মধ্যে আংশিক চালুর পর ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে এবং নিচের সড়কে কিছুটা চাপ কমেছে।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু এই প্রকল্প সম্পন্ন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজও সমানতালে এগিয়ে নিতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ঢাকাকে একটি বাইপাস করিডর দেওয়া, যাতে যেসব যানবাহনের ঢাকায় কোনো কাজ নেই, তারা শহরের ভেতরে প্রবেশ না করে সরাসরি বাইরের রুট ব্যবহার করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, কুতুবখালী পর্যন্ত সংযোগ স্থাপিত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্রুত ওঠার একটি কার্যকর করিডর তৈরি হবে। তবে যদি এই করিডর বিমানবন্দর এলাকায় এসে দীর্ঘ সময় ধরে শেষ হয়ে যায় এবং আশুলিয়া অংশের সঙ্গে সংযোগ না হয়, তাহলে উল্টো বাইরে থেকে আসা গাড়ি দ্রুত ঢাকায় প্রবেশ করবে, যা নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, ‘ঢাকাকে বাইপাস করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। ৩০-৪০ শতাংশ অপ্রয়োজনীয় যানবাহন শহরের বাইরে রেখেই চলাচল করতে পারলে নিচের সড়ক অনেকটাই ফাঁকা হবে।’
ঢাকা-আশুলিয়ায় ৬১.৫ শতাংশ কাজ শেষ : জানা গেছে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজও এখন গতি পেয়েছে। এরই মধ্যে ৬১.৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের সব জটিলতা কাটিয়ে এখন সব দিকেই কাজ চলছে। আমাদের লক্ষ্য এখন শুধু কাজ শেষ করা।’ তিনি জানান, প্রায় ৮ কিলোমিটার অংশে ডেক নির্মাণ শেষ হয়েছে এবং গার্ডার ও পিলার নির্মাণ দ্রুত এগোচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে বর্তমানে আটটি র্যাম্প নির্মাণের কাজ চলছে। এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে সংযোগ এবং বাইপাইল এলাকায় তিনস্তরবিশিষ্ট ইন্টারসেকশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই ইন্টারসেকশন চালু হলে কোনো দিকের গাড়িকেই থামতে হবে না, যে যেদিকে যাবে, সরাসরি যেতে পারবে। এতে আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট নিরসন হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নিরবচ্ছিন্ন এলিভেটেড করিডর তৈরি হবে। এতে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কুতুবখালী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওঠা যাবে। আশুলিয়া, বাইপাইল ও ইপিজেড এলাকার শিল্পপণ্য দ্রুত চট্টগ্রাম বন্দরে পরিবহন করা যাবে।