বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

লাসলো ক্রাসনাহরকাই [জন্ম: ৫ জানুয়ারি ১৯৫৪] নোবেল বিজয়ী হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্যিক। তিনি একাধারে কথাশিল্পী ও নাট্যকার। ক্রাসনাহরকাই বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান তাঁর ব্যতিক্রমী ও ক্ষুরধার উপন্যাসের জন্য। বেশির ভাগ সমালোচকই তাঁকে পোস্টমডার্ন ধারার অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, যার মধ্যে থাকে জীবনের বহু বিচিত্র রং। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ একটি গল্প ‘অ্যান অ্যাঞ্জেল পাস্‌ড অ্যাবাভ আস’-এর ধারাবাহিক অনুবাদ পত্রস্থ হলো। আজ প্রথম কিস্তি…

পর্ব :: ১

আমি সবকিছুর জন্যই প্রস্তুত, সে বলল, AK-74 রাইফেলটা একটু দূরে ঠেলে সরিয়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের নিচে হাত ঢুকিয়ে বগল চুলকাল, তারপর বলতে লাগল, ভালো লাগছে যে এতদিন পর শেষ পর্যন্ত সব কিছু বলতে পারব, কারণ এতদিন কোনো সুযোগই পাইনি, যখনই একটু ফুরসত মিলেছে তখন বড়জোর এক-দুটো ছোট কথা বলা গেছে, গোলাবর্ষণের জন্য ঘুমানোও হয়নি, কিন্তু এখন অবশেষে পুরো কথাটা এক টানে বলা যাবে, তবে শুরুতে একটা কথা বলা দরকার যে সে ভবিষ্যৎ-বিশ্লেষক বা ফিউচারোলজিস্ট নয়, সাধারণ জীবনে সে ছিল একজন ট্রেন্ড অ্যানালিস্ট, যদিও ট্রেন্ড অ্যানালিস্টের চেয়ে নিজেকে একজন পর্যবেক্ষক বলতেই সে বেশি পছন্দ করে, কেননা ভবিষ্যৎ-বিশ্লেষক বা ফিউচারোলজিস্টরা একটা ঘরে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, হ্যাঁ তাদের নিজস্ব পদ্ধতি আছে, মডেল আছে, ফিউচার্স হুইল আছে ইত্যাদি, কিন্তু সমাজ নিয়ে, মানবজাতি নিয়ে, রোবট নিয়ে এভাবে বড় পরিসরে ভাবাটা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, এসব তাদের অস্বস্তিতে ফেলে, তাই সে ভবিষ্যতের নয়, বরং ট্রেন্ডের, ডেটার, তথ্যের বিশ্লেষক–এই তিনটি শব্দে সে আলাদাভাবে জোর দিল, কিন্তু তারপর–কারণ তার মাত্র একটি চোখই মোটামুটি ঠিক ছিল, তা-ও ঝাপসা দেখে–সাবধানে হাত বাড়িয়ে নিজের নিচে থাকা কাঠের প্যালেটের কিনারা খুঁজতে লাগল, কারণ বুচায় যুদ্ধের প্রথম মাসে তার বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়েছিল আর ট্রেঞ্চের ভেতরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা হাঁটার লাঠিগুলো সব সময় পিছলে পড়ে যাচ্ছিল, এবারও লাঠি ধরতে পারল না, তাই হামাগুড়ি দিয়ে পাশের লোকটার কাছে গেল, তার বুক-কাঁধ-ঘাড় হাতড়ে খুব সাবধানে মাথাটা তুলে গুটানো জ্যাকেটের ওপর রাখল, কারণ দেখেছিল মাথাটা কাদার দিকে সরে যাচ্ছে, তারপর নিজের ঝাপসা ডান চোখটা লোকটার পেটের ব্যান্ডেজের কাছে নিয়ে এসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, আর কথা বলতে বলতে বলল, দেখো বন্ধু, ব্যাপারটা একেবারে সহজ একটা সূত্র, পৃথিবী একটা ক্লোজড সিস্টেম, মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, এখন সাড়ে সাত বিলিয়ন, শিগগিরই আট বিলিয়ন হবে, আর আমরা ভান করি যেন এটা কোনো বিশাল আশ্চর্যের ব্যাপার, কিন্তু না, আমরা অর্ধশতাব্দী ধরে জানি যে এই বিপুল মানুষের কোনো না কোনো স্বয়ংক্রিয় সহযোগিতা লাগবেই, অবশ্যই জানতাম এবং টের পাচ্ছিলাম, আর এ কারণেই–এখানে সে ইঙ্গিত দিল যে–৫০ বছরেরও বেশি আগে ২০০১: আ স্পেস ওডিসি সিনেমায় একটি দৃশ্য তাকে এতটা মুগ্ধ করেছিল, যেখানে একটি চরিত্র হাতে একটা চ্যাপ্টা যন্ত্র ধরে কিছু একটায় চাপ দিয়ে যা খুশি তাই নাড়াচ্ছে, চালু করছে বা বন্ধ করছে, আর আজ এটা আমাদের কাছে  কতটা স্বাভাবিক মনে হয়, তাই না? কিন্তু সেদিন একদমই স্বাভাবিক ছিল না, ছিল অর্থহীন, নিছক কল্পনা, শিশুসুলভ আজগুবি গল্প, আমরা হাসতাম, অথচ আজ তোমার হাতে স্মার্টফোন, তুমি যে কাউকে পেতে পারো, আগে মানুষ দূরে থাকা কারও সঙ্গে গল্প করত না–কীভাবে করবে? ফোনই ছিল না–এ কথা বলতে বলতে সে মুখ কুঁচকাল, যেন লোকটার রক্তমাখা পেটের ব্যান্ডেজটা তার পছন্দ হয়নি, আর আবার হামাগুড়ি দিয়ে নিজের প্যালেটে ফিরে গেল, সঙ্গীর জন্য পাশাপাশি দুটো প্যালেট জোড়া দিয়েছিল আর নিজের জন্য আরও দুটো, এক পায়ে এক হাতে কাদার মধ্যে টলতে টলতে এসব করেছে, সবই একটা খোঁড়া লুকানো গুহার ভেতরে, যেখানে পুরো প্লাটুন প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পালাতে বাধ্য হওয়ার পরেও শত্রুরা তাদের খুঁজে পায়নি, তারা হুমড়ি খেয়ে মাথার ওপর দিয়ে ছুটে গিয়েছিল, নিচে লোকগুলো শুধু ফাঁকা ট্রেঞ্চটা দেখে চলে গেছে, গুহার ভেতরে এই দুজনকে দেখেনি, আর তারা এখন এই গুহায় প্যালেটের ওপর শুয়ে অপেক্ষা করছে কখন কেউ ফিরে আসবে, যদিও সেটা এখনও সম্ভব হয়নি, গোলাবর্ষণ থামেনি, আর তারা এই গুহায় কয়েক ঘণ্টা ধরে পড়ে আছে দুজন মিলে চারটি প্যালেটে, ঘড়ি দেখেনি সে–ঝাপসা চোখে দেখাও যেত না–আর সময় জানতেও চায়নি, সার্জেন্ট চিৎকার করে বলে গিয়েছিল মেডিক পাঠাবে কিন্তু তারপর থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও আক্রমণ থামেনি, গোলাবর্ষণ চলছেই, তারা এখানে গুহায় পড়ে আছে চারটি প্যালেটে দুজন মিলে, আর কী করার আছে, সে বলতে লাগল, এই এগিয়ে যাওয়াগুলো এই মানসিক উত্তরণগুলো আমি ভালোবাসি, কীভাবে এরা আমাদের পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে সাহায্য করে, মানে এটা কি পাগলামি নয়? কীভাবে এটা সমস্ত ব্যবসায়িক লেনদেন বদলে দিল আর আমূলভাবে বদলে দিল যোগাযোগ ব্যবস্থা, একটা দিনে তোমার কাছে যে পরিমাণ তথ্য আসে, ইনস্টাগ্রাম দেখো শুধু একটু স্ক্রল করো, আর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখো বিশাল বিজ্ঞাপন, বিশাল বিলবোর্ড, বাসস্টপের বৈদ্যুতিক বোর্ডে পরের বাস কখন আসবে তা জানাচ্ছে, তোমার এক দিনের তথ্য একজন মধ্যযুগীয় ভূমিদাসের সারাজীবনের তথ্যের সমান, আর মনে আছে বিশ বছর আগেকার কমিউনিকেশন বিষয়ক পাঠ্যবইয়ে লেখা ছিল দিনে আটটি মনোবিচ্যুতি ঘটলে মনোযোগ নষ্ট হয়, আর এখন? আটটি মনোবিচ্যুতি ঘটতে ঘটতে তুমি সকালে শুধু টয়লেট পর্যন্তই পৌঁছাতে পারো, কারণ পথে তুমি ফোন দেখছ নতুন ই-মেইল আছে কিনা, মেসেজ আছে কিনা, ইনস্টাগ্রাম আর টুইটারে কী হচ্ছে, তারপর খবরের শিরোনামগুলোয় চোখ বোলাও, আমরা এখন সম্পূর্ণ নতুনভাবে চলি, আগের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ আর আকর্ষণীয় জীবন কাটাচ্ছি, যেমন ধরো আজকের যে কোনো কিশোর মাল্টিটাস্কিংয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে, হ্যাঁ সে নিঃসন্দেহে  প্রতিভাবান ছিল, তার মতো কোনোকালে কেউ ছিল না, কিন্তু মাল্টিটাস্ক করতে পারত না, একসময়ে একটাই কাজ করত, দু-তিন দিন ধরে একটাই কাজ করত, আর এখন? কতটা রোমাঞ্চকর, তাই না?  হ্যাঁ, রোমাঞ্চকর।

এখন সে শুধু একজন সাধারণ পদাতিক সৈনিক, কারণ সে কী কাজ করে সেটা বলেও লাভ হয়নি, তারা মনে করেছে সে বড় কোনো দায়িত্বের উপযুক্ত নয়, আর যখন দেশ রক্ষা করাটাই মুখ্য, যখন দরকার বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ, তখন বৃহত্তর সমাজ-ভাবনা অপ্রাসঙ্গিক, আর সে নির্বাচন কমিটির সামনে এটা অস্বীকার করেনি–সে স্পষ্টতই একজন তাত্ত্বিক মানুষ, তবু এক পায়ে আবার ইনফ্যান্ট্রিতে যোগ দিতে রাজি ছিল, আর তারা বলেছিল ট্রিগারে রাখার জন্য মাত্র একটা আঙুলই যথেষ্ট, আর সে হতাশ হয়নি বলা যাবে না, একটু হতাশ হয়েছিল বৈকি, কারণ দৈনন্দিন কাজে সে কম্পিউটারে খুবই দক্ষ ছিল, কিন্তু তার প্রবণতা ছিল সংস্কৃতির বিচারে কোন বিষয়কে দেখার, এটাই তাকে সত্যিকার টানত; মানে মহাজাগতিক পরিসর, তারা-নক্ষত্র এসব তার বিষয় ছিল না, আর মনস্তাত্ত্বিক স্তর, ব্যক্তি, সেটাও তার জন্য নয়, কিন্তু সংস্কৃতি কিংবা উপসংস্কৃতি, মানে মানুষ কীভাবে বদলায়, এটাই সে সব সময় পড়াশোনা করেছে, কীভাবে ইতিহাসজুড়ে আমরা প্রযুক্তির ধারা বেয়ে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলেছি, আর এখন আমরা ঠিক তেমনই এক পুনর্গঠনের মাঝে আছি, আমরা নতুন পথে পৃথিবী নথিভুক্ত করছি, নতুন পথে কথা বলছি, নতুন পথে বাঁচছি, আর এর পেছনে একটা কারণ আছে, আর তুমিও বুঝবে এই কারণটা কী, মানুষ কেন কাজ করে, কারণ আমাদের বুঝতে হবে যে সংস্কৃতি হলো মানুষের বেঁচে থাকার কৌশল, পৃথিবীতে অসংখ্য প্রজাতি আছে, আর আমাদের প্রজাতি বেঁচে থাকতে সংস্কৃতিকে বেছে নিয়েছে; কিছু প্রজাতি বিশাল দাঁত বেছে নিয়েছে, কারও শিকার ঘায়েল করতে বিশাল লেজ গজিয়েছে, কারও আছে  ভয়ংকর চোয়াল বা বিষ বা বিদ্যুৎ, কিন্তু আমরা–সে বলল, গোলাবর্ষণ চলতে চলতে ট্রেঞ্চের দুই দেয়াল থেকে বেরিয়ে থাকা শিকড়গুলোর দিকে তাকিয়ে–আমরা সংস্কৃতিকে বেছে নিয়েছি, আর আমার মতো একজন ট্রেন্ড বিশ্লেষক–ডেটা, তথ্য, বাস্তব ঘটনা দিয়ে–বিশ্লেষণ করে কোন সমস্যাগুলো এই সংস্কৃতি সমাধান করতে পারে আর কোনগুলো পারে না, কোন জিনিসগুলো প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব আর কোনগুলো নয়, কিন্তু সব সময়ই মানুষকে নিয়ে ভাবাটাই আকর্ষণীয়, আমরা কতটা এগিয়েছি, কেন এটা করি বা ওটা করি, কারণ যথার্থ পরিবর্তনগুলো বোঝা ভীষণ জরুরি, কোন মোবাইলের কোন মডেলে কী নতুন ফিচার এলো–এসব আমার কাছে একদমই আগ্রহের নয়, কিন্তু আমরা যে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গেছি তার আসল মানেটা কী, যেমন হঠাৎ করে আমরা সবাই একসঙ্গে ভয় পাই বা সবাই একসঙ্গে একে অপরকে বিশ্বাস করি, আমরা আগে কখনও এত গতিতে বাঁচিনি, কখনও এতজন ছিলাম না, জীবন কখনও এত ব্যস্ততাপূর্ণ ছিল না, এসবই আমার কাছে অত্যন্ত আগ্রহের, শুরুতেই আমি–সে নিজের দিকে আঙুল তাক করল–আমার ভাবনার শুরুটাই হয় এই বিশ্বাস থেকে যে সবাই সুখী হতে চায়, সচ্ছল হতে চায়, সুস্থ থাকতে চায়, আর ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে এর জন্য আমরা বিভিন্ন কৌশল নিয়েছি, আর এটা স্পষ্ট যে আমরা সেদিকেই যাচ্ছি, যে সবাই যতটা সম্ভব দীর্ঘ বাঁচতে চায়, যতটা সম্ভব ধনী হতে চায়, যতটা সম্ভব সুখী হতে চায়, এবং সত্যি বলতে, আমরা আগেই সেটা অর্জন করে ফেলেছি,

[ক্রমশ]

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com