এসব পণ্য বাইরে থেকে দেখতে প্রায় হুবহু হওয়ায় সাধারণ ভোক্তার পক্ষে আসল-নকল পার্থক্য করা কঠিন।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) পরিচালিত সাম্প্রতিক অভিযানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৩৪টি আমদানীকৃত কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্যের মধ্যে ১৭টিই ভেজাল, অনুমোদনহীন বা মানহীন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পরীক্ষা করা আমদানি প্রসাধনীর অর্ধেকই নিরাপদ নয়।
নকল ও ভেজাল পণ্যে দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবছর প্রায় তিন হাজার ১৭০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছেন বৈধ ব্যবসায়ীরা। এতে তাঁদের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইম্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশের প্রসাধনী বাজারের প্রায় ৩৯ থেকে ৪০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে নকল পণ্য। বছরে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার এ বাজারে নকল পণ্যের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বৈধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পড়ছে অসম প্রতিযোগিতায়।
সম্প্রতি মিরপুরের শাহ আলী প্লাজায় অভিযানে বহু বিদেশি কসমেটিকস ভেজাল হিসেবে শনাক্ত হয়। একই অভিযানে নিষিদ্ধ স্কিন-হোয়াইটেনিং ক্রিমও জব্দ করা হয়। হাতিরঝিলের পুলিশ প্লাজায় ‘দ্য কোরিয়ান মল বাংলাদেশ’ নামের একটি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে বিএসটিআই বাধ্যতামূলক সনদ ছাড়া কসমেটিকস বিক্রির প্রমাণ পায়। আমদানি তথ্য ও ছাড়পত্র দেখাতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করা হয়। একইভাবে ‘সাজগোজ’ নামের আরেক বিক্রয়কেন্দ্রেও অনুমোদন না পাওয়া বিদেশি প্রসাধনী বিক্রির দায়ে জরিমানা করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বহুল পরিচিত কিছু বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের নকল তৈরি হচ্ছে রাজধানীর পুরান ঢাকার কয়েকটি গোপন কারখানায়। সেখানে নিম্নমানের কেমিক্যাল, সুগন্ধি ও রং ব্যবহার করে নামি ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে ক্রিম, ফেসওয়াশ, সিরাম, শ্যাম্পু ও হেয়ার অয়েল। এসব কারখানার বেশির ভাগই পরিচালিত হচ্ছে আবাসিক ভবনের আড়ালে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অবৈধ পথে আমদানিও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। আমদানি শুল্ক ও মাননিয়ন্ত্রণ এড়াতে নানা কৌশলে বিদেশি প্রসাধনী দেশে আনা হচ্ছে। সম্প্রতি চকবাজারের চানখাঁরপুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে আমদানি করা ‘নবরত্ন’ ব্র্যান্ডের পণ্য জব্দ করা হয়। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের বিক্রি স্থগিত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নকল ও নিম্নমানের প্রসাধনীতে ব্যবহৃত পারদ, স্টেরয়েড, হাইড্রোকুইনোনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক দীর্ঘ মেয়াদে ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি, অ্যালার্জি, কিডনি জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে এখন আন্তর্জাতিকমানের অনেক কসমেটিকস স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। এই শিল্প ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগোচ্ছে ও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু নকল ও অবৈধ পণ্যের দৌরাত্ম্যে বৈধ উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দীন বলেন, ‘ভেজাল ও নকল কসমেটিকস শুধু বাজার নষ্ট করছে না, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।’
কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার খাতের উদ্যোক্তা ও জনপ্রিয় অভিনেতা শাকিব খান বলেন, ‘আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার খাতে এখন আর বাংলাদেশ পরনির্ভরশীল নয়। আমি আহ্বান জানাই, অল্প কিছু লাভের আশায় নকল ভেজাল কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য বিক্রি না করে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি অথেনটিক পণ্যের বিপণনে যুক্ত হওয়ার এখনই সময়।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কসমেটিকস বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু খুচরা বাজারে অভিযান যথেষ্ট নয়। আমদানি পর্যায়ে কড়াকড়ি, গোপন কারখানা উচ্ছেদ, অনলাইন বিক্রি নজরদারি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশের প্রসাধনী বাজার ধীরে ধীরে পুরোপুরি চলে যেতে পারে ভেজাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে।