সরকারি জমি ও সড়ক দখল করে রাজধানীতে গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ বাস-ট্রাকের স্ট্যান্ড, গ্যারেজ ও মোটর পার্টসের দোকান। এসব অবৈধ স্থাপনা ঢাকা মহানগরীতে যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আর সেসব স্থানে নির্বিঘ্নে চলছে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অসামাজিক কাজ। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, পুলিশ ও প্রভাবশালী মহল প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এসব অবৈধ বাস-ট্রাকের স্ট্যান্ড পরিচালনা করছে। সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থা বিভিন্ন সময় এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও কিছুদিন না যেতেই সেখানে আবার গড়ে ওঠে স্থাপনাগুলো। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গড়ে ওঠা অবৈধ বাস-ট্রাকস্ট্যান্ড ও গ্যারেজগুলো যেন রাজধানী ঢাকার বিষফোঁড়া। বিভিন্ন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের তথ্যমতে, ঢাকা শহরে সড়ক ও খাসজমি দখল করে গড়ে ওঠা বড় ও মাঝারি আকারের বাস-ট্রাক টার্মিনালের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০টি। এর বাইরেও যত্রতত্র গড়ে তোলা হয়েছে ছোট আকারের বাস ও ট্রাকস্ট্যান্ড। এসব টার্মিনাল-স্ট্যান্ড রাজধানীর যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়াত আনিসুল হক যখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তার পরপরই মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে সাতরাস্তার বৃহত্তম অবৈধ ট্রাক টার্মিনালটি উচ্ছেদে সক্ষম হন। কিন্তু অন্য কোথাও টার্মিনাল উচ্ছেদের ঝুঁকি আর কেউ নেননি। বরং সিটি করপোরেশনের কোনো কোনো জনপ্রতিনিধির ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ টার্মিনাল গজিয়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধের শহীদনগর অংশে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ট্রাক টার্মিনাল। বেড়িবাঁধ সড়কের আংশিক চলে গেছে এই ট্রাক টার্মিনালের দখলে। প্রতিদিন এই টার্মিনালে তিন শতাধিক গাড়ি রাখা হয়। ট্রাকপ্রতি একশ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। শহীদনগর অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ডের এক নেতা বলেন, এখানকার চাঁদা উঠিয়ে কাউন্সিলরসহ লালবাগ থানা ও কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশকে মাসোয়ারা হিসেবে পরিশোধ করতে হয়। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে গাবতলী পশুরহাট পর্যন্ত ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধের সড়কও এখন অঘোষিত টার্মিনালে পরিণত হয়েছে। কমপক্ষে আড়াই হাজার বাস-ট্রাক-টেম্পো পার্ক করে রাখা হয় এখানে। যানজটমুক্ত সড়ক বলে পরিচিত এই সড়কে অবৈধভাবে গাড়ি পার্ক করে রাখায় সড়কটিতেও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সায়েদাবাদ জনপথের মোড়ে ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা, রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথের জায়গা দখল করে চার শতাধিক ট্রাকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্ট্যান্ড রয়েছে। এ ছাড়া পোস্তগোলা ব্রিজসংলগ্ন সড়ক ও জনপথের জায়গা দখল করে সেখানে প্রতিদিন দুই শতাধিক ট্রাক পার্ক করা হয়। বর্তমান পাগলা বাজার পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে এই ট্রাকস্ট্যান্ড। আওয়ামী ওলামা লীগের দুই নেতা এই ট্রাকস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। চানখাঁরপুল সিগন্যাল থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক দখল করে রাখা হয় বাস-ট্রাক-টেম্পোর পাশাপাশি ঘোড়ার গাড়িও। এই সড়কের চিত্র এতই করুণ যে, গাড়ি চলাচল তো দূরের কথা, হেঁটে চলাচল করতেও কষ্ট হয় পথচারীদের। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়নের গাবতলী শাখার সভাপতি মো. সাদেক হোসেন বলেন, গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনে এবং গাবতলী গবাদিপশুর হাট-সংলগ্ন সরকারের প্রায় ১০০ একর জমি প্রভাবশালী মহলের দখলে রয়েছে। সরকার এসব জমি দখলমুক্ত করে ট্রাক টার্মিনাল গড়ে তুললে যত্রতত্র ট্রাক পার্কিং বন্ধ হবে।
এদিকে ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা হিসেবে পরিচিত মহাখালী টার্মিনাল-ঘেঁষা এয়ারপোর্ট রোডটির দুই কিলোমিটার জায়গা পুরোপুরি টার্মিনালে পরিণত হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে টার্মিনাল উপচানো গাড়িগুলো প্রধান রাস্তার ওপর অন্তত চার সারিতে পার্ক করে রাখা হয়। একচিলতে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে প্রাইভেট কার চলাচলও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শুধু সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত রাস্তাটি দখল রাখার কারণে ট্রাফিক পুলিশের একটি দুর্নীতিবাজ অংশ মাসে ছয় লাখ টাকা বখড়া হাতিয়ে নেয়। ফলে সড়কটি বন্ধ রাখা হলেও ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা সেদিকে নজরও দেন না।
কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে অবৈধ টার্মিনাল : রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচেও গড়ে উঠেছে বাস-ট্রাকের অবৈধ টার্মিনাল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠেছে এই টার্মিনাল। এ ছাড়া টার্মিনাল ঘিরে গড়ে উঠেছে যানবাহন মেরামতের বেশ কয়েকটি ওয়ার্কশপ, রেন্ট-এ-কারের অফিস, শ্রমিক কমিটি-মালিক সমিতি কার্যালয়ের নামে ঝুপড়ি বস্তির মাদক আখড়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশ কয়েক দিন ধরে কুড়িল ফ্লাইওভারের পূর্বপাশে যে স্থান থেকে ৩০০ ফুট রাস্তা শুরু হয়েছে, সেখানে সরকারি জমি দখল করেই গড়ে উঠেছে টার্মিনাল-ওয়ার্কশপ। অবৈধ টার্মিনাল ঘিরে এ এলাকায় বেড়েছে মাদকসেবী, বখাটে ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা। ফ্লাইওভার যখন নতুন ছিল তখন সন্ধ্যা হলেই সুন্দর আলোয় সজ্জিত হতো এ এলাকা। কিন্তু এখন সন্ধ্যার পর টার্মিনালের আলো-আঁধারের পরিবেশে লোকজন চলাফেরা করতেও ভয় পান। এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ডা. জিন্নাত আলী বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বিষয়টি নিয়ে খুবই চিন্তিত। বেশ কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষ হলেই আবার বাস-ট্রাক রেখে টার্মিনাল তৈরি করে অপকর্ম চালায় চক্রটি।
ভিক্টোরিয়া পার্ক টার্মিনাল ঘিরে চাঁদার ভাগাভাগি : ঢাকার জেলা প্রশাসন, কোর্ট-কাচারি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-ঘেঁষা ঘনঘিঞ্জি ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকাতেও গড়ে উঠেছে অবৈধ টার্মিনাল। রাজধানীর উত্তরা, টঙ্গী, গাবতলীসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস-মিনিবাস ও অবৈধ অটোরিকশার জমজমাট এ টার্মিনাল পেরিয়ে সদরঘাটের দিকে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিটি করপোরেশনের তালিকায় সেখানে কোনো টার্মিনাল নেই, কোনো ইজারাদারও নেই। এতে প্রতিদিন সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও লাখ লাখ টাকার চাঁদা ভাগবণ্টন করে নিচ্ছে সবাই। থানা পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ, ডিসিসি কর্মচারী, ছাত্রনেতা, পরিবহন শ্রমিক নেতাদের টাকা সমঝোতায় টার্মিনালটি বহাল থাকছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের পর বছর এখান থেকে বিভিন্ন পরিবহনের কয়েকশ বাস রাজধানী ও এর বাইরের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। প্রতিটি গাড়ির প্রতি ট্রিপ থেকে টার্মিনাল ফি বাবদ ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। সে হিসাবে দৈনিক সেখানে ৩ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে বলে জানা গেছে।
কোচগুলোর ২০ টার্মিনালে ভয়াবহ যানজট : রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়-পয়েন্টে শুধু যে ট্রাক-টেম্পোর অবৈধ টার্মিনাল গড়ে উঠেছে তা নয়, আন্তজেলা কোচগুলো ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম পয়েন্টসমূহে ২০টিরও বেশি মিনি টার্মিনাল গড়ে তুলেছে। টিকিট কাউন্টার বসানোর নামে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ টার্মিনাল রাজধানীর স্থায়ী যানজটের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টার্মিনালসদৃশ একেকটি কোচস্ট্যান্ডে যাত্রী ও মালামাল ওঠানামা, টিকিট কেনাবেচা, চেকিংয়ের নামে ৪০-৫০টি কোচ ব্যস্ততম রাস্তার ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। অবৈধ কোচ টার্মিনাল গড়ে তোলার মাধ্যমে যানজটের ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে উত্তরার আবদুল্লাহপুরে। ঢাকার উত্তরের প্রবেশদ্বার খ্যাত আবদুল্লাহপুরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অবৈধ টার্মিনাল পরিচালনা করে আসছে। তিন শতাধিক কাউন্টারের মাধ্যমে পরিচালিত দুই সহস্রাধিক আন্তজেলা কোচের পার্কিং পয়েন্ট হয়ে উঠেছে মূল সড়ক। এ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখের বেশি টাকার চাঁদাবাজি হয়। ডিসিসি ও ডিএমপি উত্তর ট্রাফিক বিভাগের নামে দৈনিক ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে টার্মিনাল চক্রের সদস্যরা। বাকি টাকা নিজেরা লুটেপুটে খায় বলে অভিযোগ রয়েছে। আবদুল্লাহপুরের আদলেই মানিকনগর, ধলপুর, যাত্রাবাড়ী, নবাবপুর রোড, কল্যাণপুর, মিরপুর-১, নর্দা, ফকিরাপুল, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কলেজ গেট এলাকায় মিনি কোচ টার্মিনাল গড়ে উঠেছে। সেসব স্থানেও প্রতিদিন বেপরোয়া চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে।