ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় জ্বালানিসংকট আরো প্রবল হচ্ছে। এই সংকট উত্তরণে দেশের জ্বালানি আমদানি সক্ষমতা বাড়াতে দুটি আধুনিক প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার কেনার উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা হবে ৪০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি)। পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই জাহাজ দুটি যুক্ত হলে দেশের পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা বছরে প্রায় ০.১ মিলিয়ন মেট্রিক টন বাড়বে, যা বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বছরে প্রায় এক কোটি ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যাবে।
প্রস্তাবনায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, এই জাহাজ দুটি ব্যবহারের মাধ্যমে বন্দরসংশ্লিষ্ট চার্জ থেকে বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতে পারে।
তিনি আরো জানান, দ্রুত এই দুটি জাহাজ সংগ্রহ করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের হার আরো বাড়বে এবং জ্বালানি পরিবহনে দেশীয় সক্ষমতা শক্তিশালী হবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের একটি পরিকল্পনা থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা। শুরুতে তিনটি জাহাজ কেনার প্রস্তাব ছিল, যার ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৬১ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিকল্পনাটি সংশোধন করে দুটি জাহাজ সরকারি অর্থায়নে এবং একটি বিএসসির নিজস্ব অর্থে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই ট্যাংকারগুলো মূলত পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন, এভিয়েশন ফুয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি ও হালকা রাসায়নিক পরিবহনে ব্যবহৃত হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন ও বিমান খাতে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে এই জাহাজগুলোকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিএসসির সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা মাত্র পাঁচটি। এর মধ্যে তিনটি তেলবাহী জাহাজ এবং দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার। অথচ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের চাহিদা পূরণে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি জাহাজ প্রয়োজন। কিন্তু ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে কোনো নতুন জাহাজ সংগ্রহ না করায় বহর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। ফলে বিদেশি শিপিং কম্পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের মধ্যে জাহাজ কেনার জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় এক হাজার ২৯৯ কোটি টাকা, যা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশ। বাকি অর্থ ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক, পরামর্শক নিয়োগ, আইনি ব্যয়, ব্যাংক চার্জ এবং বিদেশ সফরের মতো খাতে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা খাতে আট কোটি ৫৬ লাখ টাকা, সাধারণ সরঞ্জামে আট কোটি ৪৬ লাখ টাকা, পরামর্শক খাতে ৪৩ লাখ টাকা, আইনি ব্যয়ে প্রায় এক কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং ব্যাংক চার্জে চার কোটি ৩২ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
তবে এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে পিইসি সভায়। বিশেষ করে বিদেশ সফরের জন্য প্রায় চার কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলে জানা গেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জাহাজ ক্রয়, তদারকি ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের জন্য বিদেশ সফরের প্রয়োজন রয়েছে, তবে এ ব্যয় কতটা যৌক্তিক তা খতিয়ে দেখা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি পরিবহন খাতে একটি বড় অগ্রগতি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিপিং খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।