বাংলা সনের হিসেবে এখন চৈত্রের শেষভাগ। এই সময়ে সাধারণত বাড়তে থাকে তাপমাত্রা; থাকে কাঠফাটা রোদ। কিন্তু এবার প্রকৃতি যেন একেবারে ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। দেশের এক প্রান্তে অস্বাভাবিক কুয়াশা, অন্য প্রান্তে তীব্র তাপপ্রবাহ।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে পঞ্চগড়ে দেখা গেছে শীতের মতো ঘন কুয়াশা। সকাল ৮টা পর্যন্ত জেলার তেঁতুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা সাদা কুয়াশায় ঢেকে ছিল। রাস্তাঘাট, মাঠ, ফসলি জমি– সব কিছুই ছিল ঝাপসা। কোথাও কোথাও ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো জলকণা পড়ে ভিজেছে পিচঢালা সড়ক। মহাসড়কে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে হয়েছে যানবাহনকে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৯ শতাংশ। এক সপ্তাহ ধরে সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ২৮ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, চৈত্র মাসে এমন কুয়াশা একেবারেই অস্বাভাবিক। পঞ্চগড় সদর উপজেলার গোফাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সপিজুল ইসলাম বলেন, সকালে উঠে দেখি চারদিক কুয়াশায় সাদা হয়ে গেছে। বয়স্করা বলেন, চৈতে কুয়াশা হলে বৈশাখে বন্যা হয়। এখন কী হবে, আল্লাহই জানেন।
সকালে হাঁটতে বের হওয়া আবদুর রাজ্জাক বলেন, চৈত্র মাসে এমন কুয়াশা আগে দেখিনি। কুয়াশায় কাপড় ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু খুব বেশি ঠান্ডাও লাগছে না। অদ্ভুত এক আবহাওয়া।
জেলা শহরের কলেজ রোডের ভ্যানচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, শীতকালে এমন কুয়াশা দেখি। আজকে দেখে মনে হচ্ছে আবার শীত চলে এসেছে।
পরিবেশবিদ শেখ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিকতা বাড়ছে। চৈত্রে তীব্র গরম থাকার কথা, কিন্তু এখন শীতের আমেজ যাচ্ছে না। এমন ঘন কুয়াশা দেখা যাচ্ছে, যা আগে এ সময়ে ছিল না।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, এই ধরনের কুয়াশাকে ‘স্টিম ফগ’ বা বাষ্পীয় কুয়াশা বলা হয়। বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এবং দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেলে জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়ে কুয়াশা তৈরি হয়। দক্ষিণা বাতাস, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা, হঠাৎ বৃষ্টি এবং আকাশে দীর্ঘ সময় মেঘ থাকার কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গায় চলছে উল্টো চিত্র। সেখানে বইছে মাঝারি তাপপ্রবাহ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৩৪ শতাংশ। সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জেলার জনপদ। প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। তীব্র গরমে কোথাও স্বস্তি নেই। ঘরের ভেতরও যেন দম বন্ধ করা অবস্থা। চুয়াডাঙ্গা শহরের পৌরসভার সামনে সড়কের পিচ গলে উঠতে দেখা গেছে। প্রচণ্ড তাপে রাস্তার অবস্থা এমন হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক জাহিদুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে এই প্রথম তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। বর্তমানে জেলার ওপর দিয়ে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
এই গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। কৃষি শ্রমিক জামাল উদ্দিন বলেন, এই গরমে মাঠে কাজ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। একটু পরপর বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। কিন্তু বেশি বিশ্রাম নিলে কাজ শেষ হবে না, তাই বাধ্য হয়েই কাজ করছি।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই ধরনের বৈপরীত্যপূর্ণ আবহাওয়া নতুন কিছু নয়। ১০ থেকে ১২ বছর ধরে মার্চ মাসে কোথাও কুয়াশা, কোথাও আগাম তাপপ্রবাহ– এমন প্রবণতা বাড়ছে। এটিকে তারা ঋতুর স্বাভাবিক ধারার পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে এখন কুয়াশা তৈরি হচ্ছে। রাতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার আগেই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে কুয়াশা তৈরি হচ্ছে। বাতাস কম থাকায় তা সহজে সরে যেতে পারছে না।
এ দিকে চলতি এপ্রিলেই বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে এ মাসে তীব্র কালবৈশাখীসহ শিলাবৃষ্টির পাশাপাশি কয়েক দফায় তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠতে পারে ৪১ ডিগ্রিতে। এপ্রিল মাসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এমন আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।