বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

নরসিংদী হাসপাতালের ৪০ কোটির ভবনে সেবা চালু হয়নি চার বছরেও

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

নরসিংদীর বাসাইলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশেই ১০০ শয্যার নরসিংদী জেলা হাসপাতাল। প্রতিদিন নরসিংদীসহ পাশের বিভিন্ন জেলার আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। এদের একটি অংশকে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালে আরো শয্যা বাড়ানো হলেও রোগীর স্থান সংকুলান হচ্ছে না।

শিশুদের  শয্যায় একজনের পাশে অতিরিক্ত আরো একজনকে বা নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডের মেঝেতে, এমনকি বারান্দায় চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। অথচ পাশেই অব্যবহৃত পড়ে আছে ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় নির্মিত ১৫০ শয্যার নতুন ভবন। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার চার বছর পেরিয়ে গেলেও শুধু জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না—অজুহাতে চালু করা হচ্ছে না আধুনিক ভবনে চিকিৎসাসেবা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় সরকারের বিপুল বিনিয়োগ বিফলে যাচ্ছে, অন্যদিকে শয্যাসংকটে হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় ধুঁকছে রোগীরা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নিজ জেলা নরসিংদীতে জেলা হাসপাতালের এই দুরবস্থাকে সচেতন নাগরিকরা দেখছেন ‘বাতির নিচে অন্ধকার’ হিসেবেই। 

জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০১৮ সালে ১৫০ শয্যার নতুন ভবন নির্মানসহ আনুষঙ্গিক কাজ ২০২২ সালে শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ১৩ তলার ভিতসহ আটতলা ভবনে রয়েছে চারটি আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, সিসিইউ, এসডিইউ, আইসোলেশন ইউনিট ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম। হাসপাতালে ৮০টি বিশেষায়িত শয্যা রাখা হয়েছে।

দুই তলাজুড়ে থাকবে অপারেশন থিয়েটার, গাইনি ও সার্জারি ইউনিট। বিশেষায়িত এই সেবার জন্য নতুন করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, নার্সসহ বিভিন্ন পদে প্রায় ৪০০ জনবল প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নরসিংদী জেলা হাসপাতালে সেবা সম্প্রসারিত হলে ঢাকা মেডিক্যাল বা পঙ্গু হাসপাতালে রোগীর চাপ কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমবে। নরসিংদী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার রোগীদের ছোটখাটো অস্ত্রোপচার বা নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হবে না। 

গত সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে কয়েক শ রোগী চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে অপেক্ষা করছে।

রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও কর্তব্যরত কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। জেলার শিবপুর থেকে আসা রোগী শানু বেগম বলেন, ‘ডাক্তার দেখাইতে সকাল ৮টায় আসছি, এখন দুপুর ১২টা বাজছে। চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াইয়া থাইকায় শরীর আরো খারাপ হয়ে গেছে। অথচ পুরান হাসপাতালের পেছনেই নতুন বিল্ডিংটা পড়ে আছে, চালু না হওয়ায় আমাগর এই কষ্ট।’ 

হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডের শয্যার পাশাপাশি মেঝে, সিঁড়ির পাশ ও করিডরে বিছানা পেতে শুয়েছিল রোগীরা। তিল ধারণের ঠাঁই নেই কোথাও। শয্যা না পেয়ে অনেক মুমূর্ষু রোগীকেও দেখা গেছে নোংরা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে।

শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স মানছুরা বেগম জানান, শিশু ওয়ার্ডে শয্যা আছে ১০টি। রোগীর চাপে সেখানে অতিরিক্ত ১১টি শয্যা বাড়ানো হয়েছে। তার পরও সব সময় রোগী থাকে ৬০ জনের বেশি। প্রতিটি শয্যায় দুই-তিনজন রোগীর জায়গা দেওয়া হয়। তার পরও মেঝেতে শয্যা দেওয়া হয়। হাসপাতালের করিডরের মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছিল সাড়ে তিন বছরের শিশু মুসকান মিয়া। গরমে অতিষ্ঠ শিশুকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন ফুফু তৌহিদা। তৌহিদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেশি। দম নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই করিডরের মেঝেতে সিট নিয়েছি। বিদ্যুৎ চলে গেছে, পাশেই জেনারেটর পড়ে রয়েছে। সেটা চালানো হয় না, তাই গরমে বাচ্চাদের কষ্ট বেড়েছে।’

হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার শাহেরা বেগম জানান, রোগীর চাপ সামলাতে ১০০ শয্যার হাসপাতালের পুরুষ, মহিলা ও লেবার ওয়ার্ডে ১৭১টি শয্যা বাড়ানো হলে স্থান সংকুলন হয় না। প্রতিদিন আন্ত বিভাগে গড়ে ২০০ রোগী সেবা নিচ্ছে। কখনো কখনো তা  তিন শয়ে পৌঁছে।

পাশেই আধুনিক চিকিৎসার সব সরঞ্জাম স্থাপনের অপেক্ষায় থাকা নবনির্মিত ১৫০ শয্যার ভবনটি এখনো বুঝে নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নবনির্মিত ভবনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল ভবনটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনজুড়ে ধুলার প্রলেপ পড়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকৃত কর্মীরা ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্প ব্যবস্থাপক কামাল উদ্দিন জানান, ২০২২ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ করে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের অধীনে ভবনের লিফট, সেন্ট্রাল এসি, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ও অক্সিজেন প্লান্টের কাজ শেষ করা হয়েছে। কিন্তু জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এবং আসবাব ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো বুঝে নিচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা চার বছর ধরে ভবন পাহারা দিচ্ছি।’

নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছা বলেন, ‘২০২২ সালেই কাজ প্রায় শেষ করেছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দিয়েছি ভবনটি বুঝে নেওয়ার জন্য। লোকবলসংকটের কারণে এটি গ্রহণ করছে না তারা।’

সচেতন মহল বলছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় চার বছর ধরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে আধুনিক সুবিধা সংবলিত হাসপাতালের নতুন ভবন। ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নরসিংদী জেলার সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘১৫০ শয্যার ভবন চালু হলে তত্ত্বাবধায়কের পদটি হবে চতুর্থ গ্রেডের। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান ষষ্ঠ গ্রেডের। বিধি অনুযায়ী, তিনি ১৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হতে পারবেন না। তাই তিনি বিভিন্ন অজুহাতে হাসপাতালের বর্ধিত অংশের সেবা চালু করতে কালক্ষেপণ করছেন। ড্যাবের পক্ষ থেকে একাধিকবার তাঁকে হাসপাতাল চালু করতে সহযোগিতাদানের প্রস্তাব দিলেও তিনি আমাদের উপেক্ষা করছেন।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ জেলা নরসিংদী। ফলে আশায় বুক বাঁধছে এ জেলার মানুষ। অতি দ্রুত বহু অর্থ ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে হাসপাতাল প্রশাসনের দাবি, ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই ১৫০ শয্যার সমান রোগী সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। এ অবস্থায় বিশাল এই নতুন ভবনে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। ১৫০ শয্যার সেবা শুরুর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

১০০ শয্যা জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে ১০০ শয্যা চালানোর মতোও প্রয়োজনীয় জনবল নেই। চিকিৎসকরা অমানুষিক পরিশ্রম করে সেবা দিচ্ছেন। ১৫০ শয্যার ভবনে আইসিইউ, সিসিইউ চালাতে গেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বারবার আবেদন করেছি। জনবল নিয়োগ হলে নতুন ভবনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বুঝে নেওয়া হবে।’

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com