সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। কেন অনেক বৈধ প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি করতে সিন্ডিকেট করা হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী কার পরামর্শে অন্যদের বঞ্চিত করে বিদেশগামীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো– এমন প্রশ্ন ছিল মাসুদ উদ্দিনের কাছে। এর উত্তরে তিনি বলেন, জনশক্তি পাঠানোর চাহিদাপত্র এনে তিনি বিক্রি করতেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ চক্রের আরও অনেকের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মাসুদ উদ্দিন ও শেখ মামুন খালেদ এবং সংশ্লিষ্টদের এক-এগারো ভূমিকার ব্যাপারেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন সন্দেহাতীত কারও নাম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে তাদের বিদেশ যাত্রায় বিধিনিষেধ দেওয়ার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।
ডিবি সূত্র বলছে, জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলবেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, রাষ্ট্রের কোন সিন্ডিকেটের প্রভাবে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে চক্র গড়ে উঠেছিল, তা আমরা বের করব। তদন্তের প্রয়োজনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আবার হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করা হতে পারে। প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার আদালতে হাজির করা হবে তাঁকে। শেখ মামুন খালেদকে মামলাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এগারোর প্রেক্ষাপট তৈরি, কার কী ভূমিকা, কারা বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ছিলেন– এসব বিষয়ে জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হয়, সেসবের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল, অন্য কোনো রাষ্ট্রের সহায়তা ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নিয়েও চলছে জিজ্ঞাসাবাদ।
এর আগে বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে এক-এগারো সময়ের আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ এবং সোমবার রাতে বারিধারা ডিওএইচএস থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিনকে রাজধানীর পল্টন থানার মানব পাচার ও মামুন খালেদকে গণঅভ্যুত্থানের সময় মিরপুরের একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। দুজনকেই আলাদাভাবে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবি সূত্র জানায়, মাসুদ উদ্দিনের কাছে এক-এগারোর সময় তাঁর ভূমিকার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে জরুরি অবস্থা জারি হয় কার নির্দেশে এবং তখন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা কে কোন ভূমিকা পালন করেন, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। ওই সময় কে কে বঙ্গভবনে যান, কখন যান, কী আলোচনা হয়, কীভাবে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য করা হয়– এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে তদন্ত সংস্থা।
এদিকে এক-এগারোর সরকার গঠনে সেনা কর্মকর্তারা কার কার সঙ্গে লিয়াজোঁ করেছেন, কোন কোন দেশের সমর্থন ছিল, সরকার কাঠামো কীভাবে নির্ধারণ করা হয়, কীসের ভিত্তিতে করা হয় দায়িত্ব বণ্টন– এমন প্রশ্নও এসেছে। একই প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয় ড. ফখরুদ্দিন আহমেদকে সরকারপ্রধান বানানোর সিদ্ধান্ত কীভাবে এলো, তিনি কোন মহলের পছন্দ বা সুপারিশে ছিলেন? ফখরুদ্দিনের পক্ষ থেকে কোনো শর্ত বা পরিকল্পনা ছিল কিনা– সব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে। কোনো প্রশ্নে চুপ থাকছেন, আবার কোনো প্রশ্নের উত্তর জানেন না বলে দাবি তাদের।
মাইনাস টু ফর্মুলা নিয়েও দুই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আলোচিত এ প্রক্রিয়ার উদ্যোক্তা কে কে? মূল পরিকল্পনা আসলে কী ছিল? বাস্তবে দুই নেত্রীই মাইনাস, নাকি শুধু বিএনপি নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরানোই উদ্দেশ্য ছিল– তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সেনাসমর্থিত সরকার গঠনের মূল লক্ষ্য কী ছিল, অপ্রকাশিত সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা নিয়ে তারা কাজ করেছিলেন কিনা– এসেছে এমন প্রশ্নও।