মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬
  • ৩৩ বার পড়া হয়েছে

ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইতোমধ্যে দফায় দফায় বৈঠক এবং আগাম প্রস্তুতির উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই যেভাবে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে, তাতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালে জেলায় তিন হাজার ২১৯ ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন ২৪৪ জন এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন দুই হাজার ৯৭৫ রোগী। গত বছর মৃত্যুবরণকারী অধিকাংশের বয়স ছিল ৫০-৬০ বছরের মধ্যে। আর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল নান্দাইল উপজেলায়।

এদিকে চলতি বছরও ডেঙ্গু রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৩ মার্চ পর্যন্ত জেলায় ২৮ ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে সাতজন এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২১ রোগী।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কীটতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মহির উদ্দীন বলেন, বাসাবাড়ির আশপাশে ছোট ছোট পাত্রে জমে থাকা পানিই মূলত এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল। অনেক সময় পড়ে থাকা আইসক্রিমের প্যাকেট, বিস্কুট-চিপসের প্যাকেট, পরিত্যক্ত কনটেইনার কিংবা নর্দমায় অল্প পানি জমে থাকলেও সেখানে সহজেই এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। শহরে নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে তৈরি হওয়া গর্তে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা সামান্য স্যাঁতসেঁতে স্থানগুলোও এডিস মশার জন্য উপযুক্ত প্রজননক্ষেত্র।

তিনি জানান, ডেঙ্গু মশার ডিম ৮-৯ মাস পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। বৃষ্টি হলে পানির সংস্পর্শে এ ডিমগুলো দ্রুত ফুটে লার্ভায় পরিণত হয় এবং সেখান থেকেই ডেঙ্গু বিস্তারের সূত্রপাত ঘটে।

তিনি আরো বলেন, ফগিং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনেক সময় সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। কার্যকরভাবে ফগিং করার উপযুক্ত সময় হলো সকাল ৭টার আগে এবং বিকাল ৫টার পর। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন এ সময়সূচি মেনে চলে না। পাশাপাশি ওষুধ ব্যবহারের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ না করায় ফগিং কার্যক্রম প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. কাজী শাহানারা আহমেদ বলেন, স্প্রে করার কাজে নিয়োজিত কর্মীরা অনেক সময় দক্ষ না হওয়ায় মশা ঠিকমতো নিধন হয় না। এতে জীবিত থাকা মশাগুলো আরো প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে কীটনাশক নির্বাচন ও প্রয়োগ পদ্ধতি বিজ্ঞানভিত্তিক না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

কীটনাশক নিয়ে সংশয়

এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, সারা দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে যে লার্ভিসাইড বিটিআই ব্যবহার করা হচ্ছে, তা পরিবেশবান্ধব এবং মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর বলে প্রচার করা হয়। বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ, মশার শরীরের কিউটিকল, স্পাইরাকল বা মুখাপাঙ্গে পরিবর্তন হলে কীটনাশক শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মশা ধীরে ধীরে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া কীটনাশকের গুণগত মান, অ্যাকটিভ উপাদান, ড্রপলেট সাইজ, স্প্রে করার দূরত্ব ও কাভারেজের ওপরও এর কার্যকারিতা নির্ভর করে।

মশার উপদ্রব ও সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

শহরের বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানিতে মশা ও লার্ভার বিস্তার স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ, মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সিটি করপোরেশন। নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো বা লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। শহরের একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত মশার উপদ্রবে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত কোথাও মশার হাত থেকে রেহাই নেই। অনেক এলাকায় ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছড়ানো হলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

নগরীর রামবাবু রোড এলাকার বাসিন্দা জহির উদ্দিন বলেন, ‘মশার অত্যাচারে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিন-রাত ঘরে বসে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা যাচ্ছে না। সন্ধ্যা নামলেই মশার উপদ্রব এত বেড়ে যায় যে, ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরাও ঠিকভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। বাধ্য হয়ে সারাক্ষণ মশার কয়েল ও স্প্রে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে শ্বাসকষ্টের সমস্যাও বেড়ে গেছে। মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া খুবই জরুরি।’

ওষুধ সরবরাহে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

জানা গেছে, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন যেসব সরবরাহকারীর কাছ থেকে কীটনাশক কিনছে, তাদের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ তৈরিতে প্রয়োজনীয় মূল উপাদান কম ব্যবহার করা হয় এবং বাকি উপাদান বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ফলে ওষুধের মান ঠিক না থাকায় মশা ঠিকমতো মারা যায় না।

জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণের প্রভাব

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বৃদ্ধির কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। আগে ডেঙ্গুর মৌসুম সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন প্রি-মনসুন সময়েও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে জমে থাকা পানি, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বলেন, গত বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে আলাদা একটি ওয়ার্ড চালু করতে হয়েছিল। এবারও রোগীর সংখ্যা বাড়লে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি রয়েছে।

জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিশ্চিতে ইতোমধ্যে ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত ফগিং কার্যক্রমের পাশাপাশি লার্ভিসাইড ছিটানো, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরো জোরদার করা হবে। নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে সমন্বিতভাবে কাজ করে মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে জোরালো মশা নিধন অভিযান, সম্ভাব্য সব স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বর্ষা মৌসুমে ময়মনসিংহে আবারও বড় আকারে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com