এইবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্যের বঙ্গানুবাদ– ‘সকল নারী ও কন্যাশিশুর জন্য অধিকার, ন্যায্যতা, উদ্যোগ’। প্রথম শব্দতেই মনোযোগ আটকাইয়া যাইতেছে। শিশু ধর্ষণ হইতে প্রকাশ্যে খুন, অপহরণ, পারিবারিক সহিংসতার ধারাবাহিক চিত্রের সহিত এইবার যুক্ত হইয়াছে রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতির করুণ চিত্র। যেই দেশে তিন দশকের বেশি সময় ধরিয়া প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রীর আসনটি নারী নেতৃত্বের রহিয়াছিল, সেই দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণের হার মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইয়াছেন মাত্র সাতজন। অতীতেও যে এই সংখ্যা প্রতুল ছিল, তাহা বলা চলে না। তবে এইবার প্রকাশ্যে নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক দলগুলির ৫ শতাংশ নারীকেও মনোনয়ন দানে ব্যর্থতা আমাদের উদ্বিগ্ন করিয়াছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রধান বিরোধী দলসহ ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয় নাই।
নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের এই হার এইবারই প্রথম নহে। নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নারীর অংশগ্রহণের হার কখনোই সাড়ে ৫ শতাংশ অতিক্রম করিতে পারে নাই। অথচ ২০২২ সালে দেশের ষষ্ঠ জনশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় ১০০: ৯৮। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ৯৮ জন ধরা হইয়া থাকে। প্রশ্ন হইল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণকে প্রান্তিক রাখিয়া টেকসই উন্নয়ন কি আদৌ সম্ভব? নারীর অংশগ্রহণ না বাড়িলে দেশের নারীবৈরী পরিবেশের পরিবর্তন হইবে কী প্রকারে? স্মরণ রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে নারীর সমান ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের অর্থ কেবল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নহে; ইহা উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিতকরণের পূর্বশর্ত।
এইবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্যকে আনুষ্ঠানিকতার মোড়ক খুলিয়া মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করিতে হইলে রাষ্ট্র ও সমাজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলিও সন্ধান করিতে হইবে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিবন্ধন আর মনোনয়নের মধ্যকার আইনি ব্যবধান ঘুচাইব কীভাবে? রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী, দলীয় পদে নির্দিষ্ট হারে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করিতে হইবে। কিন্তু নির্বাচনে মনোনয়নের হার উল্লেখ না থাকায় এইখানে শুভঙ্করের ফাঁকি বিদ্যমান। সেই ফাঁক গলিয়া নারী মনোনয়নকে অগ্রাধিকার না দিলেও চলিতেছে রাজনৈতিক দলগুলির। এই ক্ষেত্রে মার্জারকণ্ঠে যাহাদের ঘণ্টা বাঁধিবার কথা, তাহারা কি উহাতে আগ্রহী? নাকি প্রয়োজন শেষ হইতেই বিস্মৃত হইয়াছেন নিজেদের ইশতেহারের কথা?
নারী দিবসের মাসখানিকের কম সময় পূর্বে নূতন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছে। তাহাদের আমরা একটি পুরাতন কথা নূতন করিয়া স্মরণ করাইয়া দিতে চাই। নারীর রাজনৈতিক অধিকারের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত রাখিলে দীর্ঘ মেয়াদে উহা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতে বাধ্য। নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতিকে প্রকৃত প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তর করিতে হইলে তাহাদের প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি ও মানবিক বোধকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলধারায় সংযুক্ত করিতেই হইবে। তাহা না হইলে বাংলাদেশ সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হইতে পারিবে না। যেই দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, পোশাকশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ উদাহরণ হইয়াছে, সেই দেশের নারীর রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় এখনও কাঁদিয়া কাটিয়া আকুল হইবার বিষয়টি অনুতাপের বৈ কি!
আমরা প্রত্যাশা করি, এইবারের নির্বাচনে বিজয়ী এবং সংরক্ষিত আসনের সম্ভাব্য নারী সদস্যগণকে সংসদে সমাজের প্রতিনিধি হিসাবেই দেখিতে পাইব। সংসদে কেবল নারী হিসাবে তাহাদের উপস্থিতি যেন আলংকারিক না হইয়া দাঁড়ায়। নেতৃত্বের জন্য নির্বাচিত নারীদেরও নিজেকে প্রস্তুত করিতে হইবে। আর পুরুষদিগের স্মরণে রাখিতে হইবে, নারীরা ভোট না দিলে তাহারা সংসদে আসিতে পারিতেন না। তাই নারীর রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে সংসদে পুরুষদেরও কথা বলিতে হইবে।