বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্দান গত শনিবার তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্দান গত শনিবার তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনে বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের দুটি জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে।
গত শনিবার রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মোট ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়।
গত রবিবার দ্বিতীয় দিনের মতো পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় আরো ৪০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এর মধ্যে জাজিরা এয়ারওয়েজের দুটি, এমিরেটসের পাঁচটি, গালফ এয়ারের দুটি, ফ্লাইদুবাইয়ের চারটি, কাতার এয়ারওয়েজের দুটি, সালামএয়ারের দুটি, এয়ার অ্যারাবিয়ার (শারজাহ) আটটি, কুয়েত এয়ারওয়েজের দুটি, ইউএস-বাংলার চারটি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি ফ্লাইট অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া গতকাল সোমবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৩৯টি ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়া গেছে।
ফ্লাইট বাতিলের ফলে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। বিমানবন্দরে এসেও ফিরে যাচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিক ও জরুরি প্রয়োজনে বিদেশগামীদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী যাত্রী আরমান হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ফ্লাইট দুই দিন ধরে বাতিল।
বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আকাশসীমা উন্মুক্ত না করা পর্যন্ত নিয়মিত সূচি অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এয়ারলাইনসগুলো বিকল্প পথ বা সময় নির্ধারণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
এরই মধ্যে বিভিন্ন এয়ারলাইনস তাদের ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমে ফ্লাইট বাতিলের তথ্য জানিয়ে দিয়েছে। আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য টিকিটের মেয়াদ বাড়ানো বা অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধের কারণে ইউরোপ-এশিয়া রুটের অনেক ফ্লাইট বিকল্প পথ ব্যবহার করছে, যার ফলে ভ্রমণ সময়ও বাড়ছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে।
স্থবির শাহ আমানত, বিপাকে হাজারো প্রবাসী
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে গত শনিবার থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে চট্টগ্রামের আকাশ যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গত শনিবার অপরাহ্ন থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত তিন দিনে এই বিমানবন্দর থেকে মোট ২৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল উল্লেখযোগ্য বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলো হলো—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুটি ডিপার্চার (ফিরতি) ফ্লাইট। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি অ্যারাইভাল এবং দুটি ডিপার্চার ফ্লাইট (বিকেলের একটিসহ)। এয়ার আরাবিয়ার একটি ডিপার্চার এবং বিকেলের দুুটি অ্যারাইভাল ফ্লাইট।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে আসা প্রবাসী মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, ‘আজ (সোমবার) আমার দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। অনেক কষ্টে ঋণ করে টিকিট কেটেছিলাম। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে শুনি ফ্লাইট বাতিল। বাড়িতে কান্নাকাটি চলছে। যুদ্ধের কথা শুনছি, কিন্তু সেটা যে আমার রুটি-রুজিতে এভাবে আঘাত হানবে ভাবিনি। এখন কোথায় যাব, টিকিট রিফান্ড পাব কি না কেউ স্পষ্ট করে বলছে না।’
টার্মিনালের ভেতরে ও বাইরে শত শত যাত্রীকে মালপত্র নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, কারো আবার জরুরি কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। যুদ্ধের ডামাডোলে তাঁদের স্বপ্নগুলো এখন অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা।
সব পথ যখন বন্ধের উপক্রম, তখনো ওমানগামী মাস্কাট রুটটি যেন এক চিলতে আশার আলো হয়ে টিকে আছে। ভয়াবহ সংকটের মাঝেও কিছু ফ্লাইট অপারেশন সীমিত পরিসরে সচল রয়েছে। ওমান রুটে গতকাল সকালে ওমানের সালাম এয়ারের একটি ফ্লাইট (ওভি-৪০১) ৮টা ১৫ মিনিটে অবতরণ করে এবং ৯টার ৩০ মিনিটে (ওভি-৪০২) যাত্রী নিয়ে মাস্কাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। গতকাল দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট (ইএ-১৩৫) জেদ্দা থেকে এসে অবতরণ করে এবং ২টা ৫০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এক বড় শক্তি। শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী যাতায়াত করেন। যুদ্ধের কারণে এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় কেবল বিমানবন্দর নয়, বরং সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ট্রাভেল এজেন্সিগুলোও পড়েছে চরম লোকসানে। অনেক যাত্রী অগ্রিম বুকিং বাতিল করছেন, ফলে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন থমকে গেছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যদি এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে এর বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। চট্টগ্রামের মতো প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন প্রটোকল অনুযায়ী, যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের ওপর দিয়ে বা কাছাকাছি এলাকায় ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা এবং সময়সূচিতে পরিবর্তন অব্যাহত থাকতে পারে। আমরা যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছি।’
তিনি বলেন, বর্তমানে শাহ আমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম খুলেছে, যেখান থেকে যাত্রীদের সর্বশেষ তথ্য জানানো হচ্ছে। তবে যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত এই অচলাবস্থা কাটবে কি না তার উত্তর কারো কাছে নেই।