এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; রাজধানী ঢাকার প্রাত্যহিক জীবনের এক নিয়মিত করুণ চিত্র। অফিসগামী যাত্রী, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ পথচারী কেউই এখন নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ভোরবেলা এবং গভীর রাতে চলাচলকারী মানুষজন সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক ছিনতাই স্পট বা ‘হটস্পট’ রয়েছে, যেখানে প্রতিনিয়ত ঘটছে সম্পদ ও জীবনহানির ঘটনা।
এ অবস্থায় নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকির দায়িত্ব নেওয়ার পর ছিনতাই রোধে পুলিশি কার্যক্রম গতিশীল করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসে (ফেব্রুয়ারি) ছিনতাইয়ের হার অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশের হিসাবে ডিএমপির সব থানা এলাকায় এ সময়ে মোট ৩০৮টি ছিনতাইয়ের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অন্তত কয়েক গুণ বেশি।
কারণ বেশির ভাগ ভুক্তভোগী আইনি ঝামেলা এবং থানায় দৌড়ঝাঁপ এড়াতে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন না। সবজি বিক্রেতা ফয়জুরও ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে থানামুখী হননি বলে কালের কণ্ঠকে জানান।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংঘটিত ছিনতাইয়ের ঘটনার মধ্যে ৬৫ শতাংশই ঘটছে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। এ ছাড়া ২০ শতাংশ ছিনতাই হচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এবং বাকি ১৫ শতাংশ ঘটছে ছদ্মবেশে বা কথার ছলে পথচারীদের বিভ্রান্ত করে।
ঢাকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ থানা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকা।
এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী এলাকায়ও বেশ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীর বাসিন্দা শাহাদত হোসেন জানান, প্রায় দিনই সন্ধ্যার পর যাত্রাবাড়ী মোড়ে ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারী ও টানা পার্টির সদস্যরা। ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়ে কিছু তরুণ চাকু দেখিয়ে মোবাইল ফোনসেট ও টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া বাসের জানালার কাছে বসে মোবাইল ফোনে কথা বললে ছোঁ মেরে নিয়ে চলে যাচ্ছে। রিকশায় থাকা নারীদের কানের দুল, মালা টেনে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে কয়েকটি প্রধান জোনে ভাগ করা হয়েছে। উত্তরা ও বিমানবন্দর অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের লেকপার, হাউস বিল্ডিং এলাকা, বিমানবন্দর গোলচত্বর এবং কাওলা এলাকা। মিরপুর ও গাবতলী অঞ্চলের আওতায় মিরপুর-১, ১০ ও ১২ নম্বর গোলচত্বর, টেকনিক্যাল মোড়, গাবতলী বাস টার্মিনালসংলগ্ন বেড়িবাঁধ এবং কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা। তেজগাঁঁও ও ফার্মগেট অঞ্চলে রয়েছে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং, তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়, ফার্মগেট ফুট ওভারব্রিজ এবং বিজয় সরণি মোড়। মোহাম্মদপুর ও ধানমণ্ডি অঞ্চলে রয়েছে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, তিন রাস্তার মোড়, নবোদয় হাউজিং এলাকা, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর ও লেকসংলগ্ন নির্জন এলাকাগুলো। যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ অঞ্চলের মধ্যে বেশি অনিরাপদ সায়েদাবাদ জনপথ মোড়, যাত্রাবাড়ী মোড়, শনির আখড়া এবং দোলাইরপাড় মোড় এলাকা।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ারী বিভাগের পুলিশের ডিসি মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছিনতাই স্পটগুলোতে আমরা অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছি। অনেকে ছিনতাইয়ের অভিযোগ করে। কিন্তু থানায় মামলা না করায় আমাদেরও ঝামেলায় পড়তে হয়। গ্রেপ্তারের পর জেলে পাঠানো হলেও তারা সহজেই জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাইয়ে জড়ায়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছিনতাই বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু আর্থ-সামাজিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, বেকার তরুণদের একটি বড় অংশ দ্রুত আয়ের আশায় বা মাদকের টাকা জোগাতে এই পথে নামছে। দ্বিতীয়ত, রাজধানীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট বা সিসিটিভি নেই। তৃতীয়ত, আইনি দুর্বলতা। পেশাদার ছিনতাইকারীরা জানে যে ছিনতাই একটি জামিনযোগ্য অপরাধ।
সাবেক এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার মতে, পুলিশের ধারাবাহিক নজরদারির অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশ যানজট সামলাতে এতই ব্যস্ত থাকে যে তাদের চোখের সামনে অপরাধ ঘটলেও তারা প্রতিকার করতে পারে না। রাজধানীর এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে ছিনতাই রোধে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। এরই মধ্যে আবদুল্লাহপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ছিনতাই রোধে এপিবিএন সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ থানাগুলোতে রাতের টহল ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো ভোরবেলা বা গভীর রাতে যাতায়াতের সময় অন্ধকার বা নির্জন রাস্তা এড়িয়ে চলা। রিকশায় চলার সময় ব্যাগ কোলের ওপর রাখা এবং মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকা। অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করা। ছিনতাইয়ের শিকার হলে কোনো বাধা না দিয়ে দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে ৯৯৯-এ কল করা।